ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্টের আইনি লড়াই: নিষেধাজ্ঞা শিথিলে যুক্তরাষ্ট্রের সম্মতি

ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্টের আইনি লড়াই: নিষেধাজ্ঞা শিথিলে যুক্তরাষ্ট্রের সম্মতি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ভেনেজুয়েলার কারাবন্দি সাবেক প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে দায়ের করা মাদক পাচার মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া সচল রাখতে বিশেষ পদক্ষেপ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দীর্ঘ আইনি জটিলতা ও প্রশাসনিক অনড় অবস্থানের পর, ওয়াশিংটন তাদের আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে সম্মত হয়েছে। এর ফলে ভেনেজুয়েলার বর্তমান সরকার মাদুরোর আইনজীবীদের বকেয়া পাওনা এবং আইনি লড়াইয়ের যাবতীয় ব্যয় পরিশোধ করতে পারবে।

গত শুক্রবার নিউইয়র্কের একটি আদালতে জমা দেওয়া নথিপত্র থেকে এই তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। এর আগে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কড়াকড়ির কারণে মাদুরোর আইনজীবী নিয়োগের বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল। বিবাদী পক্ষ আশঙ্কা প্রকাশ করেছিল যে, আইনজীবীদের ফি পরিশোধ করা সম্ভব না হলে শেষ পর্যন্ত পুরো মামলাটিই খারিজ হয়ে যেতে পারে।

চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে এক বিশেষ সামরিক অভিযানে ৬৩ বছর বয়সি নিকোলাস মাদুরো এবং তার স্ত্রী ৬৯ বছর বয়সি সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনী। গ্রেফতারের পরপরই তাদের নিউইয়র্কে নিয়ে আসা হয়। বর্তমানে তারা ব্রুকলিনের একটি কারাগারে বন্দি রয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে নার্কো-টেরোরিজম বা মাদক-সন্ত্রাসবাদের ষড়যন্ত্রসহ গুরুতর একাধিক অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে আদালতের প্রাথমিক শুনানিতে মাদুরো ও ফ্লোরেস নিজেদের সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করে আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন।

মাদুরোর প্রধান কৌঁসুলি ব্যারি পোল্যাক গত ফেব্রুয়ারিতে ম্যানহাটনের জেলা জজ আলভিন হেলারস্টাইনের কাছে মামলাটি খারিজের আবেদন জানিয়েছিলেন। আবেদনের যুক্তিতে বলা হয়, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে ভেনেজুয়েলা সরকার আইনজীবীদের ফি পরিশোধ করতে পারছে না। এটি একজন আসামির সাংবিধানিক অধিকারের পরিপন্থি। পোল্যাক দাবি করেন, এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকলে মাদুরো তার পছন্দের আইনজীবী নিয়োগের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, যা মার্কিন সংবিধানের ষষ্ঠ সংশোধনীর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। তারা আদালতকে জানান যে, মাদুরো দম্পতির ব্যক্তিগতভাবে এই বিপুল ব্যয় বহনের সামর্থ্য নেই, তবে ভেনেজুয়েলার বর্তমান প্রশাসন এই খরচ বহন করতে ইচ্ছুক।

মার্কিন বিচারব্যবস্থার নীতি অনুযায়ী, নাগরিকত্ব নির্বিশেষে প্রতিটি আসামি সমান আইনি সুরক্ষা ও আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার পান। গত ২৬ মার্চের এক শুনানিতে বিচারক হেলারস্টাইন মামলাটি সরাসরি খারিজ না করলেও মার্কিন প্রশাসনের অনড় অবস্থানের সমালোচনা করেন। তিনি মন্তব্য করেন, কোনো ব্যক্তিকে বিচারের মুখোমুখি করে তার আইনি সহায়তার পথ রুদ্ধ করা ন্যায়বিচারের পরিপন্থি। বিচারকের এই পর্যবেক্ষণ এবং সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা শেষ পর্যন্ত মার্কিন প্রশাসনকে তাদের অবস্থান থেকে সরে আসতে বাধ্য করেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

আদালতে সরকারি কৌঁসুলি কাইল উইরশবা এর আগে যুক্তি দিয়েছিলেন যে, ভেনেজুয়েলার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞাগুলো জাতীয় নিরাপত্তা এবং বৈদেশিক নীতির স্বার্থে গৃহীত। তিনি দাবি করেছিলেন, বিচার বিভাগ ট্রেজারি ডিপার্টমেন্টকে নিষেধাজ্ঞা শিথিলের নির্দেশ দিতে পারে না, কারণ এটি সম্পূর্ণভাবে নির্বাহী বিভাগের এখতিয়ার। তবে বিচারক হেলারস্টাইন প্রসিকিউশনের এই যুক্তি খণ্ডন করে বলেন, মাদুরো বর্তমানে মার্কিন হেফাজতে রয়েছেন এবং তিনি এখন আর যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য কোনো হুমকি নন। তাছাড়া, ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের নেতৃত্বে কারাকাস ও ওয়াশিংটনের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের যে উন্নতি ঘটছে, সেটিও আদালত আমলে নেন।

নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে এই আইনি লড়াইয়ের প্রেক্ষাপট দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দ্বন্দ্বের ফসল। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ভেনেজুয়েলায় গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস ও দুর্নীতির অভিযোগে দেশটির ওপর দফায় দফায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ওয়াশিংটন। ২০১৮ সালে মাদুরোর পুনর্নির্বাচনকে জালিয়াতি হিসেবে আখ্যা দিয়েছিল পশ্চিমা বিশ্ব। পরবর্তীতে ২০২০ সালে মাদক পাচারের অভিযোগে মাদুরোর বিরুদ্ধে পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। দীর্ঘদিনের সেই ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এখন নিউইয়র্কের আদালতের কাঠগড়ায় আইনি লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে।

মাদুরো শুরু থেকেই তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোকে ভিত্তিহীন ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে আসছেন। তার মতে, ভেনেজুয়েলার খনিজ ও তেলসম্পদ নিয়ন্ত্রণ করতেই যুক্তরাষ্ট্র এই ‘সাজানো মামলা’ তৈরি করেছে। এখন মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে অর্থ পরিশোধের পথ প্রশস্ত করায় তিনি অন্তত তার পছন্দের আইনজীবীর মাধ্যমে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পাচ্ছেন। এই পরিবর্তনের ফলে মাদক পাচার মামলার ভবিষ্যৎ এবং ভেনেজুয়েলার একসময়ের এই দাপুটে নেতার পরিণতি কোন দিকে যায়, তা এখন দেখার বিষয়।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ