স্পোর্টস ডেস্ক
বাংলাদেশের ঘরোয়া ও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের পরিচিত মুখ, সাবেক আন্তর্জাতিক আম্পায়ার ও ম্যাচ রেফারি মোহাম্মদ আসগর আর নেই। শনিবার (২৫ এপ্রিল) রাজধানী ঢাকায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৩ বছর। দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের ক্রিকেটের উন্নয়নে পর্দার আড়ালে থেকে কাজ করে যাওয়া এই নিভৃতচারী ব্যক্তিত্বের বিদায়ে ক্রীড়াঙ্গনে একটি যুগের অবসান ঘটল।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি। শনিবার বিকেলে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। আজই মরহুমের নামাজে জানাজা শেষে ঢাকার আজিমপুর কবরস্থানে তাকে রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় মর্যাদায় দাফন করার কথা রয়েছে। তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) এবং আম্পায়ার্স অ্যান্ড স্কোরার্স অ্যাসোসিয়েশন।
বাংলাদেশের ক্রিকেটের ইতিহাসের সঙ্গে মোহাম্মদ আসগরের নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর যখন এ দেশে ঘরোয়া ক্রিকেটের কাঠামো পুনর্গঠিত হচ্ছিল, তখন থেকেই তিনি মাঠের ক্রিকেটে সক্রিয় হন। আম্পায়ারিং পেশাকে তিনি কেবল দায়িত্ব হিসেবে নয়, বরং ব্রত হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। দেশের শীর্ষ স্তরের ঘরোয়া ক্রিকেট, বিশেষ করে ঢাকা প্রিমিয়ার ডিভিশন ক্রিকেট লিগ (ডিপিএল) এবং প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সম্মানিত একজন আম্পায়ার। স্টাম্পের পেছনে তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এবং নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা খেলোয়াড় ও সংগঠক উভয়ের কাছেই তাকে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছিল।
কেবল দেশের মাঠেই নয়, মোহাম্মদ আসগর আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তিনি বিদেশের মাটিতে অনুষ্ঠিত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ম্যাচে আম্পায়ারিংয়ের দায়িত্ব পালন করেন। বিশেষ করে সাতটি আন্তর্জাতিক ওয়ানডে ম্যাচে তিনি টিভি আম্পায়ার (তৃতীয় আম্পায়ার) হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। প্রযুক্তির ব্যবহার যখন ক্রিকেটে প্রাথমিক পর্যায়ে ছিল, তখন অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে তিনি সিদ্ধান্ত প্রদান করে আন্তর্জাতিক মহলে সমাদৃত হয়েছিলেন।
মাঠের আম্পায়ারিং থেকে অবসর নেওয়ার পরও তিনি ক্রিকেটের সঙ্গেই যুক্ত ছিলেন। ম্যাচ রেফারি হিসেবে তিনি ঘরোয়া ক্রিকেটের শৃঙ্খলা ও মান বজায় রাখতে কাজ করে গেছেন। ২০২১ সাল পর্যন্ত তিনি ম্যাচ রেফারি হিসেবে সক্রিয় ছিলেন, যা তার দীর্ঘায়ু কর্মজীবন এবং ক্রিকেটের প্রতি নিবেদনের প্রমাণ দেয়। নবীন আম্পায়ারদের প্রশিক্ষণ এবং মাঠের জটিল পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন একজন দক্ষ মেন্টর বা পরামর্শক।
মোহাম্মদ আসগরের মৃত্যুতে বিসিবি তাদের শোকবার্তায় তাকে ‘নিভৃত অভিভাবক’ হিসেবে অভিহিত করেছে। বোর্ড জানায়, বাংলাদেশ ক্রিকেট আজ একজন বিশ্বস্ত সেবককে হারালো। প্রচারের আলো থেকে দূরে থেকে তিনি যেভাবে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দশকের পর দশক সেবা দিয়ে গেছেন, তা বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুকরণীয় হয়ে থাকবে। বিসিবির শোকবার্তায় আরও বলা হয়, মাঠ এবং পুরো ক্রিকেট অঙ্গনে তার এই শূন্যতা সহজে পূরণ হওয়ার নয়।
ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের ক্রিকেট আজ যে অবস্থানে দাঁড়িয়েছে, তার পেছনে মোহাম্মদ আসগরের মতো মাঠের কর্মকর্তাদের অবদান অনস্বীকার্য। অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার যুগেও তিনি যেভাবে পেশাদারিত্ব বজায় রেখেছিলেন, তা দেশের আম্পায়ারিংয়ের মানোন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তার মৃত্যুতে কেবল একজন আম্পায়ার নয়, বরং ক্রিকেটের একজন নীরব কারিগরকে হারালো বাংলাদেশ। মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনার পাশাপাশি শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছে দেশের আপামর ক্রীড়াপ্রেমী সমাজ।


