আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ইরানি তেলবাহী ট্যাঙ্কার জব্দের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক ও সামুদ্রিক উত্তেজনা নতুন চরমে পৌঁছেছে। তেহরান এই পদক্ষেপকে ‘সমুদ্রে দস্যুতা’ এবং আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন হিসেবে আখ্যায়িত করে কঠোর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকায়ি ওয়াশিংটনের এমন কর্মকাণ্ডকে বিশ্ববাণিজ্যের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি বলে সতর্ক করেছেন।
সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে ইসমাইল বাকায়ি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র আইন প্রয়োগের দোহাই দিয়ে মূলত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে অন্য দেশের সম্পদ দখল করছে। তিনি অভিযোগ করেন, রাষ্ট্রীয় পতাকা ও আইনি প্রক্রিয়ার আড়ালে সমুদ্রে জাহাজ আটক করার এই প্রবণতা আধুনিক জলদস্যুতারই নামান্তর। এটি কেবল সামুদ্রিক নিরাপত্তা নীতিমালার লঙ্ঘন নয়, বরং বৈশ্বিক বাণিজ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে যা দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক আস্থা ক্ষুণ্ন করবে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পারস্য উপসাগর ও এর সংলগ্ন গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোতে ইরানি তেলবাহী ট্যাঙ্কারকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্রের এই তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ওয়াশিংটন তাদের একতরফা নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার অজুহাতে বিভিন্ন সময়ে ইরানি জ্বালানি বহনকারী জাহাজ জব্দ করে আসছে। তেহরান শুরু থেকেই একে সার্বভৌমত্বের ওপর নগ্ন হস্তক্ষেপ এবং আন্তর্জাতিক জলসীমায় বেআইনি কার্যক্রম হিসেবে বর্ণনা করছে। বাকায়ির মতে, এ ধরনের উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করার পাশাপাশি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা বা এনার্জি সাপ্লাই চেইনকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
সামুদ্রিক নিরাপত্তার প্রশ্নে ইরানের এই অবস্থান কেবল একটি দেশের প্রতিবাদ নয়, বরং তা বৈশ্বিক মুক্ত বাণিজ্য নিশ্চিত করার দাবি হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর অবাধ চলাচলের অধিকার রক্ষা করা আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইনের অন্যতম মূল ভিত্তি। সেখানে প্রভাবশালী কোনো রাষ্ট্রের একতরফা হস্তক্ষেপ সামুদ্রিক রুটগুলোকে অনিরাপদ করে তুলছে। বিশেষ করে ওরমজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে সামরিক বা আইনি উত্তেজনার ফলে বীমা খরচ ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পায়, যার চূড়ান্ত প্রভাব পড়ে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে।
ভৌগোলিক ও কৌশলগত কারণে পারস্য উপসাগর অঞ্চলটি বৈশ্বিক জ্বালানি অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড হিসেবে পরিচিত। এখান দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের মোট চাহিদার একটি বড় অংশ জ্বালানি তেল পরিবাহিত হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই পাল্টাপাল্টি অবস্থানের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের নৌপথগুলোতে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র তাদের নিষেধাজ্ঞা নীতির কঠোর প্রয়োগ চাইছে, অন্যদিকে ইরান পাল্টা প্রতিরোধের মাধ্যমে নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের সংঘাত নিরসনে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বা জাতিসংঘের কার্যকরী ভূমিকা প্রয়োজন। অন্যথায়, সমুদ্রে রাষ্ট্রীয় শক্তি প্রদর্শনের এই সংস্কৃতি যদি প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়, তবে ভবিষ্যতে অন্য দেশগুলোও একই পথ অনুসরণ করতে পারে। এতে করে আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমা আইনগত কাঠামোর পরিবর্তে শক্তিনির্ভর হয়ে ওঠার আশঙ্কা রয়েছে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ইরানের এই কড়া হুঁশিয়ারি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, সামনের দিনগুলোতে সামুদ্রিক বাণিজ্য পথ নিয়ে ভূ-রাজনৈতিক লড়াই আরও জটিল রূপ ধারণ করতে পারে, যা বিশ্ব অর্থনীতির পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ায় নতুন বাধা হয়ে দাঁড়াবে।


