জাতীয় সংসদ ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তিটি জাতীয় সংসদে উপস্থাপন এবং এর শর্তাবলি পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। বুধবার স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদ অধিবেশনের শুরুতে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে তিনি এই দাবি উত্থাপন করেন। একইসঙ্গে চুক্তিতে বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী কোনো ধারা থাকলে সরকার যেন তা বাতিলের সাংবিধানিক ও আইনি ক্ষমতা প্রয়োগ করে, সে বিষয়েও তিনি দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জন্য নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্ব শেষে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পেয়ে রুমিন ফারহানা বলেন, গত মঙ্গলবার মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে দেশের বাণিজ্যমন্ত্রীর একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। ওই বৈঠকে রাষ্ট্রদূত দুই দেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের ভারসাম্য রক্ষা, কৃষি ও জ্বালানি পণ্য আমদানি এবং বাংলাদেশে বিনিয়োগ উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করতে নীতি সংস্কারের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাসের লক্ষ্যেই এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তবে এই চুক্তির সময়কাল এবং এর বৈধতা নিয়ে জোরালো প্রশ্ন তোলেন এই সংসদ সদস্য। তিনি বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে অর্থাৎ ৯ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই চুক্তিটি স্বাক্ষর করে। সেই সময় নাগরিক সমাজ এবং বিভিন্ন গবেষণা সংস্থা (থিঙ্ক ট্যাঙ্ক) থেকে আপত্তি তোলা হয়েছিল যে, একটি অন্তর্বর্তীকালীন বা অনির্বাচিত সরকার এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদি ও গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত চুক্তি স্বাক্ষর করতে পারে না। তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে বিষয়টি আমলে না নেওয়ায় তখন জনমনে সংশয় তৈরি হয়েছিল।
রুমিন ফারহানা অভিযোগ করেন, এই চুক্তিতে এমন কিছু ধারা বা শর্ত রয়েছে যা বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। যেহেতু বর্তমানে একটি নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব পালন করছে, তাই জনস্বার্থে চুক্তিটি সংসদে উপস্থাপন করা জরুরি। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, চুক্তির শর্ত অনুযায়ী সরকার চাইলে ৬০ দিনের নোটিশে এটি বাতিলের প্রক্রিয়া শুরু করতে পারে। জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা রক্ষায় এই অধিকার প্রয়োগের সুযোগ খতিয়ে দেখার জন্য তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
বক্তব্য চলাকালীন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ তাকে থামিয়ে দিয়ে সংসদীয় কার্যপ্রণালী বিধির কথা স্মরণ করিয়ে দেন। স্পিকার বলেন, রুমিন ফারহানার বক্তব্যটি কারিগরিভাবে ‘পয়েন্ট অফ অর্ডার’ এর আওতায় পড়ে না। সংসদীয় রীতিনীতি অনুযায়ী পয়েন্ট অব অর্ডার কেবল সংসদের চলমান কার্যবিবরণী বা শৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। যেহেতু তিনি একটি নতুন ও নীতিগত প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন, তাই নিয়ম অনুযায়ী যথাযথ নোটিশ দিলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে বলে স্পিকার আশ্বস্ত করেন।
স্পিকারের বক্তব্যের পর রুমিন ফারহানা অতিরিক্ত সময় চেয়ে পুনরায় দাবি করেন যে, চুক্তিটি লুকোছাপা না করে অবিলম্বে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি বা সরাসরি সংসদে আলোচনার জন্য আনা হোক। তবে স্পিকার তার এই দাবিটি তাৎক্ষণিকভাবে গ্রহণ না করে পরবর্তী নির্ধারিত কার্যসূচিতে চলে যান।
উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের এই বাণিজ্যিক সমঝোতা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আগে থেকেই নানা বিতর্ক বিদ্যমান। বিশেষ করে শুল্ক কাঠামো, মেধাস্বত্ব এবং শ্রম অধিকার সংক্রান্ত বিষয়গুলো এই চুক্তিতে কীভাবে স্থান পেয়েছে, তা নিয়ে ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে। সংসদ সদস্যের এই দাবি ভবিষ্যতে সংসদীয় বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।


