জাতীয় সংসদ ডেস্ক
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ২৪তম দিনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের রাজনৈতিক জ্ঞান ও সংসদীয় শিষ্টাচার নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। বুধবার (২৯ এপ্রিল) সংসদীয় অধিবেশনে বক্তব্য প্রদানকালে তিনি বিরোধী দলীয় সদস্যদের সংসদীয় রীতিনীতি রপ্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং তাদের জন্য বিশেষ কর্মশালার প্রস্তাব দেন।
বক্তব্যের শুরুতেই মন্ত্রী সংসদীয় কার্যপ্রণালী বিধি সম্পর্কে বিরোধী দলের সদস্যদের অপরিপক্বতার বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বিরোধী শিবিরের সদস্যরা প্রায়ই অবগত থাকেন না যে কোন বিধিতে বক্তব্য দিতে হয় বা নির্দিষ্ট ইস্যুতে সংসদে কীভাবে সোচ্চার হতে হয়। সংসদ নেতা তারেক রহমানকে সমগ্র সংসদের নেতা হিসেবে অভিহিত করে মন্ত্রী প্রস্তাব দেন যে, বিরোধী দলের সদস্যদের শানিত ও পরিপক্ব করতে প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি সান্নিধ্যে বিশেষ কর্মশালার আয়োজন করা উচিত। এর মাধ্যমে তারা সংসদীয় রীতিনীতি ও আচরণ সম্পর্কে সম্যক ধারণা লাভ করতে পারবেন বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে শেখ রবিউল আলম বলেন, ১৯৪১ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি দল, যাদের জনগণ কখনও ব্যালটের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন করেনি, তাদের রাজনৈতিক যন্ত্রণায় ভোগা স্বাভাবিক। তিনি উল্লেখ করেন, যারা নির্বাচনের আগে নিজেদের অতীত কর্মকাণ্ডের জন্য জনগণের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে বাধ্য হয়, তারা মূলত রাজনৈতিকভাবে ব্যর্থ। এ সময় তিনি বিরোধী পক্ষকে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি না করার আহ্বান জানান।
বিগত ২০২৬ সালের সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল স্মরণ করিয়ে দিয়ে মন্ত্রী বলেন, দেশের মানুষ বিএনপিকে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রদানের মাধ্যমে ষড়যন্ত্রকারীদের অপচেষ্টা নস্যাৎ করে দিয়েছে। তিনি জনসমর্থনের পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেন, ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের পক্ষে দেশের ৭১ শতাংশ মানুষ রায় দিয়েছে। এর মধ্যে ৫১ শতাংশ মানুষ স্পষ্টভাবে চেয়েছে যে, বিএনপির দেওয়া রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ফর্মুলায় দেশ পরিচালিত হোক। এই বিশাল জনমত বর্তমান সরকারের বৈধতা ও কর্মপরিকল্পনার শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।
নিজের সুদীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের স্মৃতিচারণ করে মন্ত্রী আবেগহীন ও তথ্যনিষ্ঠভাবে সংসদকে জানান যে, বর্তমান সংসদ ও গণতান্ত্রিক কাঠামো কোনো বিশেষ মহলের দয়া বা করুণার দান নয়। দীর্ঘ ১৭ বছরের নিরবচ্ছিন্ন এবং রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ফসল হিসেবে আজকের এই অবস্থান। নিজের ত্যাগের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনে তাকে ১৯৩টি মামলার মুখোমুখি হতে হয়েছে, ৯ বার কারাবরণ করতে হয়েছে এবং গুম ও রিমান্ডের মতো দুঃসহ পরিস্থিতির শিকার হতে হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রশংসা করে শেখ রবিউল আলম বলেন, হাজারো নেতাকর্মীর জীবনের বিনিময়ে এবং ত্যাগের মধ্য দিয়ে অর্জিত এই গণতন্ত্র কোনো সুনির্দিষ্ট গোষ্ঠীর ষড়যন্ত্রে নস্যাৎ হতে দেওয়া হবে না। তিনি সতর্ক করে বলেন, জনসমর্থনহীন রাজনীতি এবং ষড়যন্ত্রের পথ পরিহার করে বিরোধী দলকে গঠনমূলক রাজনীতিতে মনোনিবেশ করতে হবে। অন্যথায় তারা রাজনৈতিকভাবে ইতিহাসের আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
আলোচনায় মন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন যে, সংসদের কার্যকারিতা বৃদ্ধির জন্য শক্তিশালী এবং জ্ঞানসম্পন্ন বিরোধী দল অপরিহার্য। তবে সেই বিরোধিতার ভিত্তি হতে হবে তথ্য ও সংসদীয় আইন অনুযায়ী। অযৌক্তিক হইচই বা বিধি বহির্ভূত আচরণ সংসদের গরিমা ক্ষুণ্ণ করে। তাই রাষ্ট্র পরিচালনার মূলধারায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে হলে বিরোধী দলকে অবশ্যই সংসদীয় শিষ্টাচার ও জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাতে হবে।
পরিশেষে, সেতুমন্ত্রী দেশের উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং গণতন্ত্রকে সুসংহত করতে সকল পক্ষকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান। তিনি স্পষ্টভাবে জানান যে, সরকারের প্রধান লক্ষ্য জুলাই সনদের পূর্ণ বাস্তবায়ন এবং জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এ লক্ষ্যে যেকোনো অপপ্রচার বা অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির প্রচেষ্টাকে রাজনৈতিকভাবেই মোকাবিলা করা হবে।


