ক্রীড়া ডেস্ক
২০১১ সালের মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে মহেন্দ্র সিং ধোনির সেই ঐতিহাসিক ছক্কাটি ভারতের ক্রিকেট ইতিহাসে এক অনন্য মুহূর্ত। তবে সেই দৃশ্যটি কেবল একটি শিরোপা জয়ের স্মারক ছিল না, বরং একজনের ব্যক্তিগত জীবনের মোড় পরিবর্তনের অনুঘটক হিসেবেও কাজ করেছিল। সেই ছক্কা দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে ২১ বছর বয়সে ক্রিকেট শুরু করা রঘু শর্মা আজ ৩৩ বছর বয়সে মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের জার্সিতে আইপিএলের আঙিনায় নিজের নাম লিখিয়েছেন। পেশায় একজন ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হয়েও প্রতিকূলতা জয় করে ক্রিকেটের সর্বোচ্চ পর্যায়ে তার এই অভিষেক ক্রীড়াবিশ্বে এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
রঘু শর্মার বেড়ে ওঠা একটি উচ্চশিক্ষিত পরিবারে, যেখানে সদস্যের প্রায় সবাই ডাক্তার কিংবা ইঞ্জিনিয়ার। স্বাভাবিকভাবেই খেলাধুলার সাথে তার পরিবারের সংযোগ ছিল অত্যন্ত ক্ষীণ। তিনি নিজেও একজন সফল ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন। যখন অধিকাংশ ক্রিকেটার বয়সভিত্তিক পর্যায় শেষ করে জাতীয় দলের পথে থাকেন, ঠিক সেই ২১ বছর বয়সে রঘু প্রথমবার পেশাদার ক্রিকেট খেলার সিদ্ধান্ত নেন। এই সিদ্ধান্তটি কেবল সাহসীই ছিল না, বরং অনেকের কাছেই ছিল অবিশ্বাস্য।
পেশাদার ক্রিকেটে আসার শুরুতে রঘুর সবচেয়ে বড় বাধা ছিল তার শারীরিক গঠন। সে সময় তার ওজন ছিল প্রায় ১০২ কেজি। তার বাবাও শুরুতে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন যে, এই শারীরিক অবস্থা নিয়ে পেশাদার পর্যায়ে খেলা আদৌ সম্ভব কি না। তবে লক্ষ্য অর্জনে অটল রঘু কিংবদন্তি লেগ স্পিনার শেন ওয়ার্ন এবং দক্ষিণ আফ্রিকান স্পিনার ইমরান তাহিরকে নিজের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেন। ওজন কমিয়ে ফিটনেস ফিরে পেতে তিনি কঠোর পরিশ্রম শুরু করেন। ক্রিকেটের সূক্ষ্ম কৌশলগুলো রপ্ত করতে তিনি কেবল ভারতে সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং শ্রীলঙ্কা এবং ইংল্যান্ডে গিয়েও উন্নত প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন।
রঘু শর্মার আইপিএল যাত্রার সূত্রপাত ঘটে ২০২৫ সালে। মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের নিয়মিত বাঁহাতি স্পিনার ভিগনেশ পুথুর ইনজুরিতে পড়লে বিকল্প হিসেবে তাকে দলে নেওয়া হয়। ওই মৌসুমে কোনো ম্যাচ খেলার সুযোগ না পেলেও মুম্বাই ম্যানেজমেন্ট তার দক্ষতা ও নিবেদনের ওপর আস্থা রেখে ২০২৬ সালের আসরের জন্যও তাকে রিটেইন বা ধরে রাখে। দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটে চলতি মাসে চেন্নাই সুপার কিংসের বিপক্ষে হাইভোল্টেজ ম্যাচে, যেখানে ৩৩ বছর বয়সে তার আইপিএল অভিষেক হয়।
অভিষেকের পর নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিতেও খুব বেশি সময় নেননি এই লেগ স্পিনার। লক্ষ্ণৌ সুপার জায়ান্টসের বিপক্ষে নিজের দ্বিতীয় ম্যাচেই তিনি প্রথম উইকেটের স্বাদ পান। ফর্মে থাকা ব্যাটার অক্ষত রঘুবংশীকে আউট করে তিনি আইপিএল ক্যারিয়ারের প্রথম সাফল্যটি অর্জন করেন। তার বোলিংয়ের বৈচিত্র্য এবং লাইন-লেংথ এরই মধ্যে ক্রিকেট বিশ্লেষকদের নজর কেড়েছে।
রঘু শর্মার এই উত্থান বিশ্বজুড়ে উঠতি অ্যাথলেটদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। সাধারণত মনে করা হয়, পেশাদার ক্রিকেটে প্রবেশের পথ কেবল বয়সভিত্তিক পর্যায় থেকেই শুরু হয়। কিন্তু রঘু প্রমাণ করেছেন, সঠিক জেদ, পরিশ্রম এবং লক্ষ্য থাকলে যে কোনো বয়সেই সাফল্যের শিখরে পৌঁছানো সম্ভব। একজন ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করা ব্যক্তিটি এখন মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের মতো বিশ্বমানের ফ্র্যাঞ্চাইজির অন্যতম ভরসা।
ধোনির সেই ছক্কা থেকে পাওয়া অনুপ্রেরণাকে পুঁজি করে রঘু আজ যে অবস্থানে পৌঁছেছেন, তা কেবল তার ব্যক্তিগত সাফল্য নয় বরং এটি ধৈর্য ও কঠোর সংগ্রামের এক প্রতিফলন। ৩৩ বছর বয়সে আইপিএলের মতো জমকালো আসরে একজন লেগ স্পিনার হিসেবে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করা রঘু শর্মা এখন ভারতীয় ঘরোয়া ক্রিকেটের এক অনুপ্রেরণামূলক নাম। তার এই যাত্রা আগামী দিনে অনেক স্বপ্নদ্রষ্টাকে নতুন করে পথ দেখাবে।


