আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর থেকেই রাজ্যটির বিভিন্ন প্রান্তে ব্যাপক রাজনৈতিক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। গত ৪ মে ফল প্রকাশের পর সোমবার রাত থেকে শুরু হওয়া এই উত্তেজনায় এখন পর্যন্ত একাধিক প্রাণহানি, পুলিশ কর্মকর্তার ওপর গুলিবর্ষণ এবং রাজনৈতিক কার্যালয় ভাঙচুরের খবর পাওয়া গেছে। তৃণমূল কংগ্রেস ও ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)—উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত হামলার অভিযোগ তুলেছে।
সহিংসতার কেন্দ্রবিন্দু ও প্রাণহানি
ভোট-পরবর্তী এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে বীরভূম ও হাওড়ায়। বীরভূমের নানুরে আবির শেখ নামে এক তৃণমূল কর্মীকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। পরিবারের দাবি, রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় বিজেপি কর্মীরা তাকে ঘিরে ধরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে। অন্যদিকে, হাওড়ার উদয়নারায়ণপুরে যাদব বর নামে ৪৮ বছর বয়সী এক বিজেপি কর্মীকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে তৃণমূলের বিরুদ্ধে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জয়ের আনন্দে আবির খেলার সময় তার ওপর হামলা চালানো হয়। পুলিশ এই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে একজনকে গ্রেপ্তার করেছে।
পুলিশ কর্মকর্তার ওপর হামলা ও ভাঙড় পরিস্থিতি
সহিংসতা দমনে গিয়ে খোদ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও আক্রমণের শিকার হচ্ছেন। উত্তর ২৪ পরগনার ন্যাজাট থানার রাজবাড়ি এলাকায় তৃণমূল ও বিজেপি সমর্থকদের সংঘর্ষ থামাতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ভরত প্রসূন কর। পুলিশ জানায়, একটি বাড়ির ভেতর থেকে ছোড়া গুলি তার পায়ে লাগে। এই ঘটনায় এক কনস্টেবলও আহত হয়েছেন। বর্তমানে তারা কলকাতার চিত্তরঞ্জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
দক্ষিণ ২৪ পরগনার ভাঙড় এলাকায় পরিস্থিতি অত্যন্ত থমথমে। সেখানে ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্ট (আইএসএফ) এবং বিজেপির বিরুদ্ধে বাড়িঘর ভাঙচুর ও তৃণমূল কর্মীদের মারধরের অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে নিমকুড়িয়া ও বেঁওতা গ্রামে একাধিক রাজনৈতিক নেতার বাড়িতে হামলা এবং সিসি ক্যামেরা ভাঙচুর করা হয়েছে। তৃণমূলের অভিযোগ, নারীদের ওপরও শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়েছে।
রাজনৈতিক কার্যালয়ে হামলা ও মুর্শিদাবাদে গুলি
রাজ্যের উত্তর থেকে দক্ষিণ—প্রায় সব প্রান্তেই রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যালয় হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। শিলিগুড়ির ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডে মেয়র গৌতম দেবের দলীয় কার্যালয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। বারুইপুর, কৃষ্ণনগর ও বর্ধমানসহ বিভিন্ন এলাকায় তৃণমূলের কার্যালয় দখলের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ পাওয়া গেছে। এছাড়া মঙ্গলবার রাতে মুর্শিদাবাদের ডোমকলে শফিকুল ইসলাম নামে এক সিপিএম কর্মীকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে মুর্শিদাবাদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের প্রতিক্রিয়া
সহিংসতা নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, ভোটের ফল প্রকাশের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাদের অন্তত ৩০০-৪০০ দলীয় কার্যালয় ভাঙচুর করা হয়েছে এবং ১৫০ জন প্রার্থীর বাড়িতে হামলা হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবং ক্ষতিগ্রস্ত কর্মীদের পাশে দাঁড়াতে তৃণমূলের পক্ষ থেকে ১২ সদস্যের একটি অনুসন্ধান কমিটি গঠন করা হয়েছে।
অন্যদিকে, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য এই সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে রাজ্যের মুখ্যসচিব দুষ্মন্ত নারিয়ালার কাছে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। তিনি প্রশাসনকে নিরপেক্ষভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি বিজেপি কর্মীদের শান্ত থাকার এবং কোনো ধরনের উসকানিতে পা না দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
স্থিতিশীলতার সংকট ও উদ্বেগ
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা নতুন কোনো ঘটনা না হলেও, এবারের সংঘাতের ব্যাপকতা সাধারণ মানুষের মনে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। প্রশাসনিক কঠোরতা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। রাজ্যজুড়ে মোতায়েন থাকা পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীকে শান্তি বজায় রাখতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। আগামী দিনগুলোতে এই অস্থিরতা নিরসনে প্রশাসন কী ভূমিকা নেয়, তার ওপরই নির্ভর করছে রাজ্যের স্থিতিশীলতা।


