অর্থ ও বাণিজ্য ডেস্ক
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইউই) বাজারে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাকের আয়ে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। চলতি ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে (জানুয়ারি-মার্চ) গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি আয় কমেছে প্রায় ২০ শতাংশ। একই সময়ে বিশ্ববাজার থেকে সামগ্রিকভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের তৈরি পোশাক আমদানি কমলেও, প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের রপ্তানি পতনের হার সবচেয়ে বেশি।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিসংখ্যান সংস্থা ইউরোস্ট্যাটের সাম্প্রতিক প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে (জানুয়ারি-মার্চ) ইইউভুক্ত দেশগুলোতে বাংলাদেশ ৪ হাজার ৫৯১ মিলিয়ন (৪৫৯ দশমিক ১ কোটি) ইউরোর তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে। অথচ ২০২৫ সালের একই সময়ে এই রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ৬৮৭ মিলিয়ন (৫৬৮ দশমিক ৭ কোটি) ইউরো। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে এই তিন মাসে বাংলাদেশ ১ হাজার ৯৬ মিলিয়ন ইউরোর সমপরিমাণ রপ্তানি আয় হারিয়েছে, যা শতাংশের হিসাবে প্রায় ১৯ দশমিক ২৭ শতাংশ হ্রাস পাওয়ার সমান।
ইউরোস্ট্যাটের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ইউরোপের বাজারে তৈরি পোশাকের সামগ্রিক চাহিদাই বর্তমানে নিম্নমুখী। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে বিশ্ববাজার থেকে ইইউ-এর সামগ্রিক পোশাক আমদানি কমেছে ১১ দশমিক ৬২ শতাংশ। ২০২৫ সালের জানুয়ারি-মার্চ সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন যেখানে ২৩ হাজার ৮৬০ মিলিয়ন ইউরোর পোশাক আমদানি করেছিল, ২০২৬ সালের একই সময়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২১ হাজার ৮৮ মিলিয়ন ইউরোতে।
ভোক্তা পর্যায়ে তৈরি পোশাকের এই সামগ্রিক চাহিদা হ্রাসের প্রভাব পড়েছে বিশ্বের প্রায় সব শীর্ষস্থানীয় পোশাক রপ্তানিকারক দেশের ওপর। এই সময়ে ইউরোপের বাজারে শীর্ষ পোশাক রপ্তানিকারক দেশ চীনের রপ্তানি কমেছে ৮ শতাংশ। এছাড়া অন্যান্য প্রধান রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে তুরস্কের ১৯ শতাংশ, পাকিস্তানের ১৭ শতাংশ, কম্বোডিয়ার ১৬ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়ার ১৮ শতাংশ, শ্রীলঙ্কার ১২ শতাংশ এবং ভারতের পোশাক রপ্তানি কমেছে ১০ শতাংশ।
তবে পোশাক আমদানির এই সামগ্রিক মন্দার মধ্যেও বাংলাদেশের প্রধান বৈশ্বিক প্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েতনাম ইউরোপের বাজারে নিজেদের অবস্থান প্রায় অপরিবর্তিত রাখতে সক্ষম হয়েছে। ২০২৫ সালের প্রথম তিন মাসে ভিয়েতনাম ইউরোপে ১ হাজার ৭৫ মিলিয়ন ইউরোর পোশাক রপ্তানি করেছিল, যা ২০২৬ সালের একই সময়ে মাত্র ২ শতাংশ কমে ১ হাজার ৫২ মিলিয়ন ইউরোতে নেমেছে। অন্যদিকে প্রধান প্রতিযোগী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় কমার হার (প্রায় ২০ শতাংশ) সবচেয়ে বেশি, যা দেশের তৈরি পোশাক খাতের জন্য একটি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইউরোস্ট্যাটের তথ্যমতে, বাংলাদেশের এই আয় হ্রাসের পেছনে মূল কারণ রপ্তানি পণ্যের পরিমাণ কমে যাওয়া এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের একক মূল্য বা ইউনিট প্রাইস হ্রাস পাওয়া। গত বছরের একই প্রান্তিকের তুলনায় চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে ইউরোপে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির ভৌত পরিমাণ (কোয়ান্টিটি) কমেছে ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। এর চেয়েও বড় ধাক্কা এসেছে পণ্যের মূল্যের ক্ষেত্রে; এই সময়ে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশী পোশাকের গড় দাম কমেছে ১১ দশমিক ৯৩ শতাংশ।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, ইউরোপের বাজারে মূল্যস্ফীতি, ভূ-রাজনৈতিক সংকট এবং ভোক্তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণে সামগ্রিক আমদানি হ্রাস পেয়েছে। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে রপ্তানি আয় এতটা নাটকীয়ভাবে কমে যাওয়ার পেছনে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন সক্ষমতা, গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট, লজিস্টিকস খাতের সীমাবদ্ধতা এবং তৈরি পোশাকের আন্তর্জাতিক মূল্যের ওপর সঠিক দরকষাকষির অভাব অন্যতম কারণ হতে পারে। একই বাজারে ভিয়েতনামের মাত্র ২ শতাংশ পতন ইঙ্গিত করে যে, উচ্চ মূল্যের এবং বৈচিত্র্যময় পণ্যের বাজারে প্রবেশ করতে না পারলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতকে আগামী দিনে আরও তীব্র প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হবে। বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি এই তৈরি পোশাক খাতের রপ্তানি পতন রোধে এখনই টেকসই নীতি ও কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি।


