খেলাধুলা ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যাঞ্চল ও পূর্বাঞ্চল এবং কানাডার একাংশে আসন্ন তীব্র তাপপ্রবাহের পূর্বাভাস ফুটবল বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের ম্যাচগুলোর আয়োজনকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। আবহাওয়াবিদদের মতে, একটি বিশাল উচ্চচাপ বলয় দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার কারণে উত্তর আমেরিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা একযোগে বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে সৃষ্ট চরম অস্বস্তিকর আবহাওয়া মাঠের খেলোয়াড় ও গ্যালারির দর্শকদের জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আবহাওয়া দপ্তরের সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, দিনের পাশাপাশি রাতের তাপমাত্রাও স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক উর্ধ্বে থাকবে। ফলে সাধারণত শীতল সময়ে আয়োজিত সন্ধ্যার ম্যাচগুলোতেও দাবদাহের প্রভাব বজায় থাকবে। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশেষ করে নিউইয়র্ক এবং এর আশপাশের শহরগুলোতে গত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হতে পারে। আর্দ্রতার কারণে অনুভূত তাপমাত্রা (হিট ইনডেক্স) মানুষের সহ্যক্ষমতার বাইরে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা হিট স্ট্রোকের মতো জীবনঘাতী পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
এই চরম প্রতিকূল আবহাওয়া আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা ও শারীরিক সক্ষমতার বিষয়টি পুনরায় সামনে এনেছে। গত বছর উত্তর আমেরিকায় অনুষ্ঠিত ক্লাব পর্যায়ের আন্তর্জাতিক ফুটবলেও তীব্র গরমের কারণে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল। সে সময় বিশ্বব্যাপী খেলোয়াড়দের অধিকার রক্ষা সংক্রান্ত সংগঠনগুলো আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট সূচি নির্ধারণে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকে বিবেচনা করার জন্য জোর দাবি জানিয়েছিল।
চলতি বিশ্বকাপে চরম গরমের সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবল নিয়ন্ত্রণ সংস্থা প্রতিটি ম্যাচের প্রথমার্ধ ও দ্বিতীয়ার্ধে বাধ্যতামূলক তিন মিনিটের ‘কুলিং ব্রেক’ বা পানিবিরতির নিয়ম কার্যকর করেছে। এই বিরতিতে খেলোয়াড়রা তরল খাবার ও পানি পানের মাধ্যমে নিজেদের শরীরকে আর্দ্র রাখার সুযোগ পাচ্ছেন। তবে ক্রীড়া বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, এই অতিরিক্ত বিরতি ম্যাচের স্বাভাবিক গতি ও ছন্দ ব্যাহত করছে। এর বিপরীতে চিকিৎসকেরা একে খেলোয়াড়দের পেশাগত স্বাস্থ্য ও জীবন সুরক্ষায় একটি অপরিহার্য পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে পরিস্থিতি আরও অবনতি হলে অতিরিক্ত সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে এখনও সুনির্দিষ্ট কোনো ঘোষণা আসেনি।
এদিকে বিশ্বকাপ ভেন্যুগুলোর একটি অন্যতম শহর কানাডার টরন্টোতে ইতিমধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে তাপপ্রবাহের সতর্কতা জারি করা হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশেষ জরুরি পরিকল্পনা কার্যকর করেছে, যার মধ্যে রয়েছে স্টেডিয়ামের আশপাশে পর্যাপ্ত ছায়াযুক্ত স্থান ও জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা।
বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো যেসকল স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, সেগুলোর কাঠামোগত পার্থক্যের কারণে আবহাওয়াগত প্রভাবও ভিন্ন হবে। যেসব ভেন্যুতে সম্পূর্ণ ছাদ বন্ধ করার সুবিধা (রিট্র্যাক্টবল রুফ) এবং অত্যাধুনিক শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা রয়েছে, সেখানে খেলোয়াড় ও দর্শকেরা তুলনামূলক নিরাপদ থাকবেন। তবে খোলা স্টেডিয়ামগুলোতে তীব্র রোদে ও গরমে ম্যাচ পরিচালনা করা এবং দীর্ঘ সময় গ্যালারিতে অবস্থান করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হবে।
জরুরি চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা দর্শকদের উদ্দেশ্যে কড়া সতর্কবার্তা দিয়েছেন। চিকিৎসকদের মতে, ম্যাচ চলাকালীন বা স্টেডিয়ামে আসার পথে কোনো সমর্থক যদি অতিরিক্ত দুর্বলতা, মাথা ঘোরা, তীব্র ক্লান্তি বা বমি বমি ভাব অনুভব করেন, তবে তাকে অবিলম্বে খেলা দেখা স্থগিত করে নিরাপদ ও শীতল স্থানে চলে যেতে হবে। দর্শকদের জন্য পর্যাপ্ত পানি পান নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘ সময় সরাসরি সূর্যের আলো থেকে দূরে থাকা বাধ্যতামূলক করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বিশ্বকাপের শিরোপা নির্ধারণী নকআউট পর্বের উত্তেজনা যখন তুঙ্গে, তখন মাঠের লড়াইয়ের পাশাপাশি প্রকৃতির এই চরম আচরণ টুর্নামেন্টের সফল সমাপ্তির ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্রীড়া নৈপুণ্য প্রদর্শনের পাশাপাশি অংশীজনদের সুস্থ ও নিরাপদ রাখাই এখন আয়োজক দেশগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।


