রাজনীতি ডেস্ক
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান ভারতের দুই কূটনীতিকের সঙ্গে তাঁর বাসায় সাক্ষাৎকে ‘গোপন বৈঠক’ হিসেবে উপস্থাপনের দাবিতে প্রকাশিত সংবাদকে বিভ্রান্তিকর আখ্যা দিয়ে এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা ১৯ মিনিটে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এ নিন্দা জানান এবং ভবিষ্যতে প্রকৃত তথ্য যাচাই না করে এমন সংবাদ প্রচার থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান।
পোস্টে দেওয়া ব্যাখ্যায় জামায়াত আমির বলেন, গতকাল একটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল—প্রতিবেশী দেশ ভারত হওয়ায় দেশটির সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ, বৈঠক বা কূটনৈতিক পর্যায়ের কথাবার্তা হয় কি না। উত্তরে তিনি জানান, গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে অসুস্থতার কারণে চিকিৎসা শেষে বাসায় ফেরার পর দেশ-বিদেশের বহু ব্যক্তি ও কূটনৈতিক প্রতিনিধিদল তাঁর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে এসেছিলেন। এ সময় অন্যান্য দেশের কূটনীতিকদের পাশাপাশি ভারতের দুই কূটনীতিকও তাঁর বাসায় এসে তাঁর শারীরিক অবস্থার খোঁজ নেন এবং অন্যান্য সাক্ষাৎপ্রার্থীদের মতোই তাঁদের সঙ্গেও স্বল্পপরিসরে আলাপ হয়।
ডা. শফিকুর রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সাক্ষাৎটি কোনো রাষ্ট্রীয় বা দ্বিপক্ষীয় নীতি-নির্ধারণী বৈঠক ছিল না, বরং অসুস্থতার পর শারীরিক খোঁজখবর নেওয়ার উদ্দেশ্যে অনুষ্ঠিত একটি সৌজন্য সাক্ষাৎ। তিনি জানান, বাসায় আসা বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে সাক্ষাতের বিষয়টি দলীয় যোগাযোগ শাখার মাধ্যমে প্রকাশ্যে জানানো হয়েছিল এবং ভারতের কূটনীতিকদের সঙ্গে সাক্ষাতের ক্ষেত্রেও একইভাবে তা প্রকাশ করতে আগ্রহী ছিলেন তাঁরা। কিন্তু ভারতের কূটনীতিকরা ওই সময় সাক্ষাতের বিষয়টি প্রচারে না দেওয়ার জন্য ব্যক্তিগতভাবে অনুরোধ জানান। সেই অনুরোধের প্রেক্ষিতে তখন এটি প্রকাশ্যে জানানো হয়নি।
জামায়াত আমির বলেন, সাক্ষাতের সময় তাঁদের স্পষ্ট জানানো হয়েছিল—ভবিষ্যতে দুই দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বৈঠক হলে তা অবশ্যই প্রকাশ্যে জানানো হবে এবং এতে কোনো গোপনীয়তার অবকাশ নেই। তিনি দাবি করেন, এই অবস্থান জানানোর পরও দেশের কিছু গণমাধ্যম ওই সাক্ষাৎকে ‘গোপন বৈঠক’ হিসেবে চিত্রায়িত করে সংবাদ প্রকাশ করেছে, যা প্রকৃত তথ্যের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয় এবং এতে ভুল বার্তা ছড়ানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে বহুস্তরীয় এবং ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সংবেদনশীল। কূটনৈতিক পর্যায়ের যোগাযোগ বা সৌজন্য সাক্ষাৎ প্রায়ই আনুষ্ঠানিক আলোচনার পূর্বসূত্র হিসেবে কাজ করে, তবে অসুস্থতা পরবর্তী ব্যক্তিগত খোঁজ নেওয়ার সাক্ষাৎকে নীতি-নির্ধারণী বৈঠকের সমতুল্য বিবেচনা করা যথাযথ নয়। তাঁরা মনে করেন, রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে বিদেশি কূটনীতিকদের সাক্ষাৎ একটি স্বাভাবিক কূটনৈতিক অনুশীলন, যা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আস্থা বিনির্মাণ, রাজনৈতিক পরিবেশ বোঝাপড়া এবং দ্বিপক্ষীয় সম্ভাব্য সংলাপের ক্ষেত্র প্রস্তুতে সহায়ক ভূমিকা রাখে। তবে এসব সাক্ষাতের উদ্দেশ্য, পরিসর ও প্রেক্ষাপট যাচাই না করে ‘গোপন’ বা ‘অপ্রকাশ্য’ ফ্রেমিংয়ে সংবাদ পরিবেশন করলে তা ভুল ব্যাখ্যা তৈরি করতে পারে এবং জনপরিসরে বিভ্রান্তি ছড়াতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বাংলাদেশে নিযুক্ত বিদেশি কূটনীতিকরা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করেন। এই যোগাযোগের মধ্যে থাকে সৌজন্য সাক্ষাৎ, মতবিনিময়, রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা নেওয়া, নির্বাচন পূর্ব পরিবেশ মূল্যায়ন, বাণিজ্য ও নিরাপত্তা ইস্যুতে সম্ভাব্য সংলাপের ক্ষেত্র অন্বেষণসহ নানা আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক আলোচনা। কূটনৈতিক শিষ্টাচার অনুযায়ী, ব্যক্তিগত অসুস্থতার পর খোঁজ নিতে যাওয়া সাক্ষাৎগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রচারবিমুখ থাকে, বিশেষত যখন কূটনৈতিক পক্ষ থেকেই তা প্রকাশে অনাগ্রহ জানানো হয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের অনুরোধ সম্মান করা কূটনৈতিক প্রোটোকলের অংশ, এবং তা নীতি-গোপনীয়তা বা রাষ্ট্রীয় বৈঠকের ইঙ্গিত বহন করে না।
জামায়াতে ইসলামীর বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান ও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে দলটির প্রভাব বিবেচনায় এ ধরনের ভুল ব্যাখ্যার সংবাদ রাজনৈতিক মেরুকরণ বাড়াতে পারে বলে বিশ্লেষকরা সতর্ক করছেন। তাঁরা বলেন, রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে বিদেশি কূটনীতিকদের সাক্ষাতের সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে তথ্য যাচাই, বক্তব্যের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ এবং উদ্দেশ্যের স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া গণমাধ্যমের পেশাগত দায়িত্বের অন্তর্গত।
ডা. শফিকুর রহমান তাঁর পোস্টে আরও উল্লেখ করেন, সাক্ষাৎপ্রাপ্ত কূটনীতিকদের সঙ্গে আলাপের বিষয়বস্তুতে কোনো গোপনীয়তা ছিল না এবং দলীয় অবস্থান আগেই স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছিল। তিনি বলেন, ওই সাক্ষাতের সংবাদকে ‘গোপন বৈঠক’ হিসেবে ব্যাখ্যা করার মতো কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই এবং এতে তথ্যগত ভুলের পাশাপাশি রাজনৈতিক বিভ্রান্তি সৃষ্টির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
গণমাধ্যম বিশ্লেষকরা মনে করেন, এ ঘটনার মাধ্যমে সংবাদ পরিবেশনে উৎস যাচাই, বক্তব্যের পূর্ণাংশ বিবেচনা, কূটনৈতিক প্রোটোকল অনুধাবন এবং প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণের প্রয়োজনীয়তা নতুন করে সামনে এসেছে। সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে কূটনৈতিক শিষ্টাচার, রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা এবং তথ্যের সঠিক ব্যাখ্যা নিশ্চিত করা জাতীয় দৈনিকগুলোর পেশাগত মান রক্ষার জন্য অত্যাবশ্যক।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কূটনৈতিক সাক্ষাৎ ও মতবিনিময়ের সংবাদ পরিবেশন বরাবরই গুরুত্ব বহন করে। তবে সৌজন্য সাক্ষাৎ, ব্যক্তিগত খোঁজ নেওয়ার আলাপ এবং আনুষ্ঠানিক নীতি-সংলাপের বৈঠক—এই তিন স্তরের পার্থক্য স্পষ্টভাবে নির্ধারণ ও পাঠকের সামনে উপস্থাপন করা পেশাদার সাংবাদিকতার মৌলিক শর্ত বলে সংশ্লিষ্টরা মত দিয়েছেন।


