শিক্ষা ডেস্ক
রাজধানীর আগারগাঁওয়ের আবুল বাসার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি ২০২৬) সকালে বই বিতরণ কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার জানিয়েছেন, শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিনেই প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের মাঝে শতভাগ নতুন পাঠ্যবই বিতরণ সম্পন্ন হয়েছে। এ বছর সরকার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক মিলিয়ে মোট ৩০ কোটি বিনামূল্যের বই ছাপিয়েছে, যা জাতীয় পাঠ্যপুস্তক কার্যক্রমের আওতায় দেশের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে।
উদ্বোধন শেষে উপদেষ্টা অধ্যাপক বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার বলেন, প্রাথমিক স্তরের বই ছাপা ও বিতরণ কার্যক্রম নির্ধারিত সময়ের আগেই সম্পন্ন হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। তাঁর বক্তব্যে বইয়ের গুণগত মান উন্নয়নের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি জানান, এবারের বইয়ের মান আগের তুলনায় অধিক টেকসই, পাঠবান্ধব ও উন্নত ছাপা-মানসম্পন্ন। অন্তর্বর্তী সরকারের তত্ত্বাবধানে পাঠ্যবই উৎপাদন ও সরবরাহে যে তদারকি ও মাননিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে, তার মাধ্যমে বইয়ের কাগজ, ছাপা, বাঁধাই ও ডিজাইনে উল্লেখযোগ্য উন্নতি এসেছে।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য বই ছাপা ও বিতরণের কাজ ১০০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। তবে মাধ্যমিক স্তরের বইয়ের ৬০ শতাংশ ইতোমধ্যে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে পৌঁছেছে। মাধ্যমিক স্তরের বাকি ৪০ শতাংশ বই দ্রুততম সময়ের মধ্যে শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছাতে বিতরণ প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। মাঠ পর্যায়ে বই সরবরাহের ক্ষেত্রে প্রাথমিক স্তরের মতো মাধ্যমিক স্তরেও বিভাগ, জেলা, উপজেলা ও স্কুলভিত্তিক ডেলিভারি মনিটরিং সেল কাজ করছে।
এ বছর পাঠ্যবই বিতরণ কার্যক্রম পূর্ববর্তী বছরের ‘বই উৎসব’ আকারে অনুষ্ঠিত হয়নি। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে রাষ্ট্রীয় শোক চলমান থাকায় আনুষ্ঠানিক বই উৎসব আয়োজন স্থগিত রাখা হয়। ফলে বই বিতরণ কার্যক্রম উৎসবমুখর অনুষ্ঠান না করে অনানুষ্ঠানিক ও সুশৃঙ্খল প্রক্রিয়ায় শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। রাজধানীর উদ্বোধনী বিদ্যালয় ছাড়াও দেশের অন্যান্য প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে একই দিনে শ্রেণিকক্ষে পাঠ্যবই সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়।
সরকারের বিনামূল্যের বই ছাপা ও বিতরণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে জাতীয় শিক্ষানীতি ও প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিইডিপি-৪) কাঠামোর আলোকে। এই কর্মসূচির আওতায় প্রাথমিক শিক্ষার অবকাঠামো, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, পাঠ্যক্রম আধুনিকায়ন ও শিক্ষাসামগ্রী সরবরাহের সমন্বিত উদ্যোগ বাস্তবায়িত হচ্ছে। পিইডিপি-৪ অনুযায়ী, পাঠ্যবইয়ের মান উন্নয়ন ও সময়মতো সরবরাহ নিশ্চিতকরণকে প্রাথমিক শিক্ষার অন্যতম প্রধান সূচক হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বছরের প্রথম দিনেই প্রাথমিক স্তরের শতভাগ বই বিতরণ নিশ্চিত হওয়া শিক্ষার ধারাবাহিকতা ও পাঠদান শুরুর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। সময়মতো বই পৌঁছালে শ্রেণি কার্যক্রম নির্ধারিত রুটিন অনুযায়ী শুরু করা সম্ভব হয়, শিক্ষার্থীদের শিখন-ঘাটতি কমে এবং মূল্যায়ন কার্যক্রম পরিকল্পনামাফিক পরিচালনা করা যায়। এর ফলে শিক্ষার মানোন্নয়ন, ঝরে পড়া হ্রাস, এবং শিক্ষার্থীদের পাঠে মনোযোগ বৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক স্তরে দেশে মোট সরকারি, বেসরকারি, রেজিস্টার্ড, কমিউনিটি, পরীক্ষণ বিদ্যালয় ও ইবতেদায়ি মিলিয়ে প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজারের বেশি বিদ্যালয় রয়েছে, যেখানে ২ কোটির বেশি শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। এই বিশাল সংখ্যক শিক্ষার্থীর জন্য বই ছাপা ও সরবরাহ একটি জটিল লজিস্টিক কার্যক্রম, যা কেন্দ্রীয় গুদাম থেকে বিভাগীয় ডিপো, জেলা ও উপজেলা গুদাম হয়ে বিদ্যালয় পর্যায়ে পৌঁছায়। বই সরবরাহের প্রতিটি ধাপে পরিবহন, সংরক্ষণ, ডিপো ব্যবস্থাপনা, বিদ্যালয়ভিত্তিক তালিকা যাচাই, এবং মনিটরিং কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
এ বছর পাঠ্যবই ছাপায় কাগজ সংগ্রহ, মুদ্রণ ও বাঁধাই কার্যক্রমে আন্তর্জাতিক মানের স্পেসিফিকেশন অনুসরণ করা হয়েছে বলে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। মান নিয়ন্ত্রণে নমুনা যাচাই, কাগজের জিএসএম পরীক্ষা, বাঁধাইয়ের দৃঢ়তা পরীক্ষা, রঙের স্থায়িত্ব যাচাই, এবং পরিবেশগত টেকসই মানদণ্ড পর্যবেক্ষণ করা হয়। বই উৎপাদন কার্যক্রমে টেন্ডার ও মুদ্রণ-প্রক্রিয়া তদারকিতে অন্তর্বর্তী সরকারের নিয়োগকৃত বিশেষ মনিটরিং টিম ও সরকারি কারিগরি কমিটি কাজ করেছে।
মাঠ পর্যায়ে বই সরবরাহের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণে জেলা প্রশাসন, উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়, জেলা ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস, এবং স্কুল ম্যানেজমেন্ট কমিটিগুলো সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালন করছে। বই পৌঁছানোর পর শ্রেণিশিক্ষক ও প্রধান শিক্ষক তালিকা অনুযায়ী বিতরণ নিশ্চিত করেন এবং বিতরণ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জমা দেন।
বই বিতরণ কার্যক্রমের ফলে শিক্ষার্থীরা নির্ধারিত পাঠ্যক্রম অনুযায়ী পাঠগ্রহণ শুরু করতে পারছে। প্রাথমিক স্তরের বই বিতরণ সম্পন্ন হওয়ায় স্কুলগুলোতে নিয়মিত পাঠদান কার্যক্রম শুরু হয়েছে। মাধ্যমিক স্তরের বই বিতরণও দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য পরিবহন ও সরবরাহ কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
এ বছর বিনামূল্যের বই বিতরণ কার্যক্রমে কোনো ধরনের বাণিজ্যিক, রাজনৈতিক বা প্রচারণামূলক বার্তা যুক্ত করা হয়নি। পুরো কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে রাষ্ট্রীয় শিক্ষাসেবার অংশ হিসেবে, যার লক্ষ্য দেশের প্রতিটি শিক্ষার্থীকে শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই মানসম্মত বই পৌঁছে দেওয়া।


