রুশ-বেলারুশ যৌথ সামরিক তৎপরতার আশঙ্কা: ইউক্রেন ও ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোতে নতুন হামলার ছক

রুশ-বেলারুশ যৌথ সামরিক তৎপরতার আশঙ্কা: ইউক্রেন ও ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোতে নতুন হামলার ছক

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ইউক্রেনের চলমান যুদ্ধে প্রতিবেশী বেলারুশকে সরাসরি সম্পৃক্ত করতে রাশিয়া জোর তৎপরতা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। তাঁর দাবি, মস্কো বেলারুশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে ইউক্রেনের উত্তরাঞ্চল অথবা ন্যাটোভুক্ত কোনো প্রতিবেশী দেশে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানোর পরিকল্পনা করছে।

গতকাল শুক্রবার সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টেলিগ্রামে দেওয়া এক বিবৃতিতে জেলেনস্কি এই তথ্য জানান। তিনি উল্লেখ করেন, ইউক্রেনের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে বেলারুশকে আরও গভীরভাবে জড়িয়ে নেওয়ার জন্য রাশিয়ার ক্রমাগত চেষ্টার পর্যাপ্ত প্রমাণ ও নথি ইউক্রেনীয় গোয়েন্দারা সংগ্রহ করেছে। ক্রেমলিন বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেকসান্দার লুকাশেঙ্কোকে একটি ‘নতুন সামরিক অভিযানে’ যোগ দিতে রাজি করানোর জন্য চাপ প্রয়োগ করছে বলেও তিনি দাবি করেন।

ইউক্রেনীয় গোয়েন্দা তথ্যের বরাত দিয়ে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি জানান, রাশিয়া বেলারুশের দক্ষিণ ও উত্তর দিক থেকে একযোগে সামরিক অভিযানের ছক কষছে। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বেলারুশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে সরাসরি ইউক্রেনের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ চেরনিহিভ ও রাজধানী কিয়েভ অঞ্চলের দিকে অগ্রসর হওয়া অথবা পার্শ্ববর্তী কোনো ন্যাটো সদস্য দেশের ওপর হামলা চালানো হতে পারে। তবে নিরাপত্তা ও কৌশলগত কারণে এই সম্ভাব্য অভিযানের বিষয়ে বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করেননি তিনি। ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী, বেলারুশের দক্ষিণে ইউক্রেন এবং উত্তর ও পশ্চিমে ন্যাটোভুক্ত দেশ পোল্যান্ড, লিথুয়ানিয়া ও লাটভিয়া অবস্থিত। ফলে বেলারুশ যুদ্ধে জড়ালে তা পুরো ইউরোপীয় অঞ্চলের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলবে।

জেলেনস্কির এই গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে রাশিয়া বা বেলারুশের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া বা মন্তব্য পাওয়া যায়নি। মস্কো সাধারণত তাদের সামরিক পরিকল্পনার বিবরণ কঠোরভাবে গোপন রাখে, যা দেশটির রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নীতিমালার অংশ।

রাজনৈতিক ও সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, বেলারুশের প্রেসিডেন্ট আলেকসান্দার লুকাশেঙ্কো রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের অন্যতম ঘনিষ্ঠ ও নির্ভরযোগ্য মিত্র। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে পূর্ণাঙ্গ সামরিক অভিযান শুরু করার সময় বেলারুশ তাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করে রুশ বাহিনীকে ইউক্রেনে প্রবেশের অনুমতি দিয়েছিল। তবে চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধে লুকাশেঙ্কো এখন পর্যন্ত বেলারুশের নিজস্ব সশস্ত্র বাহিনীকে সরাসরি ইউক্রেনের অভ্যন্তরে লড়াইয়ে পাঠাননি। অবশ্য যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মিনস্ক ও মস্কোর সামরিক সহযোগিতা আরও জোরদার হয়েছে। বেলারুশ ইতিমধ্যে তাদের ভূখণ্ডে রাশিয়ার ট্যাকটিক্যাল পারমাণবিক অস্ত্র এবং অত্যাধুনিক হাইপারসনিক ‘ওরেশনিক’ ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের অনুমতি দিয়েছে, যা পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ইউক্রেন তার প্রতিরক্ষাব্যবস্থা জোরদারে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। জেলেনস্কি জানিয়েছেন, আলেকসান্দার লুকাশেঙ্কো যদি কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নেন এবং রাশিয়ার যুদ্ধকালীন উদ্দেশ্যকে সমর্থন জানান, তবে ইউক্রেন নিজের সার্বভৌমত্ব ও জনগণকে রক্ষায় কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তুলবে। সম্ভাব্য এই হুমকি মোকাবিলায় তিনি ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা বাহিনীকে পাল্টা হামলার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা প্রস্তুত করার এবং উত্তরের চেরনিহিভ ও কিয়েভ অঞ্চলের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও সীমান্ত নিরাপত্তা সর্বোচ্চ জোরদার করার নির্দেশ দিয়েছেন।

এদিকে, ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভের দারনিতস্কি এলাকার একটি নয়তলা আবাসিক ভবনে ভয়াবহ রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনায় গতকাল আক্রান্ত অঞ্চলে রাষ্ট্রীয় শোক পালন করা হয়েছে। ওই হামলায় কমপক্ষে ২৪ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হন। এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে একে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে অভিহিত করেছে ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে, ইউক্রেনীয় বাহিনী রাশিয়ার অভ্যন্তরে পাল্টা প্রতিরোধমূলক হামলা চালিয়েছে। রাশিয়ার কয়েকটি অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো এবং সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে বড় ধরনের দূরপাল্লার ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। কিয়েভের পক্ষ থেকে এই পাল্টা জবাবকে সম্পূর্ণ ন্যায্য এবং দেশের আত্মরক্ষার জন্য অপরিহার্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ফ্রন্টলাইনের বাইরে দুই দেশের এই পাল্টাপাল্টি হামলা এবং বেলারুশকে কেন্দ্র করে নতুন সামরিক মেরুকরণ চলমান যুদ্ধকে আরও দীর্ঘস্থায়ী ও সহিংস করে তুলতে পারে।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ