শিক্ষা ডেস্ক
ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (ডুয়েট) নতুন ভাইস চ্যান্সেলর (ভিসি) বা উপাচার্য নিয়োগকে কেন্দ্র করে ছাত্র বিক্ষোভ ও ত্রিমুখী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইকবালকে ডুয়েটের নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দিয়ে সরকারের প্রজ্ঞাপন জারির পর থেকেই এই উত্তেজনার সূত্রপাত হয়। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ক্যাম্পাসে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার (১৪ মে) রাতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ থেকে নতুন উপাচার্য নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এই সিদ্ধান্তকে ডুয়েটের সাধারণ শিক্ষার্থীরা মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানান এবং ওই রাতেই ক্যাম্পাসে তাৎক্ষণিক বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। শিক্ষার্থীদের দাবি, কোনো বহিরাগত বা অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে ডুয়েটের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া যাবে না। এর ধারাবাহিকতায় শুক্র ও শনিবার ক্যাম্পাসে এক ধরনের থমথমে পরিস্থিতি ও ছোট আকারের সমাবেশ অব্যাহত থাকে।
রবিবার (১৭ মে) সকালে পূর্বঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থান নেন। একপর্যায়ে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একাংশ এবং বহিরাগতদের মধ্যে একটি ত্রিমুখী বিরোধের সৃষ্টি হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, আন্দোলন চলাকালে হঠাৎ করেই বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটক ভেঙে কিছু বহিরাগত ব্যক্তি লাঠিসোঁটাসহ ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে। তারা আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর অতর্কিত হামলা চালালে মুহূর্তের মধ্যে পুরো শহীদ মিনার ও প্রশাসনিক ভবন এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়।
হামলা ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনায় বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী ও সাধারণ আন্দোলনকারী আহত হয়েছেন। সংঘর্ষের পরপরই ক্যাম্পাসে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং সাধারণ শিক্ষার্থীরা নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ছোটাছুটি শুরু করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিও চিত্রে দেখা যায়, রক্তাক্ত অবস্থায় বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থীকে উদ্ধার করে স্থানীয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আহতদের গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ স্থানীয় বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের একটি বড় দল ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে। তারা ধাওয়া দিয়ে বহিরাগতদের ক্যাম্পাস থেকে বের করে দেয় এবং আন্দোলনরতদের শান্ত করার চেষ্টা করে। গাজীপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আমিনুল ইসলাম সার্বিক পরিস্থিতির বিষয়ে গণমাধ্যমকে বলেন, “ক্যাম্পাসে নতুন উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। বর্তমানে ঘটনাস্থলে পর্যাপ্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন রয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং যেকোনো ধরনের বড় অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে পুলিশ কাজ করে যাচ্ছে। এখন ক্যাম্পাস এলাকার পরিস্থিতি আমাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।”
এদিকে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের মূল দাবি অত্যন্ত স্পষ্ট। ডুয়েটের প্রশাসনিক ও অ্যাকাডেমিক কাঠামো অন্যান্য সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে কিছুটা ভিন্ন হওয়ায়, এখানকার অভ্যন্তরীণ যোগ্য ও জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের মধ্য থেকেই উপাচার্য নিয়োগ দিতে হবে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, অন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আসা শিক্ষকরা ডুয়েটের বিশেষায়িত শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষার্থীদের আবাসন সমস্যা, সেশনজট এবং প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পারেন না। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়। অভ্যন্তরীণ শিক্ষকদের মধ্য থেকে উপাচার্য নির্বাচিত হলে তিনি ডুয়েটের সামগ্রিক বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জগুলো শুরু থেকেই কার্যকরভাবে মোকাবিলা করতে পারবেন বলে শিক্ষার্থীরা মনে করেন।
এই সংঘর্ষের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম সাময়িকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে। প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও ডুয়েটের শিক্ষক সমিতির নেতৃবৃন্দ উদ্ভূত পরিস্থিতি নিরসনে জরুরি বৈঠকে বসেছেন বলে জানা গেছে। তবে সরকারি প্রজ্ঞাপন বাতিল বা শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে নেওয়ার বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কিংবা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত, ডুয়েট ক্যাম্পাসে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে এবং যেকোনো নতুন অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে পুলিশি টহল জোরদার রাখা হয়েছে।


