তথ্যপ্রযুক্তি ডেস্ক
জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের সার্ভারে বড় ধরনের প্রযুক্তিগত বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। শুক্রবার (১২ জুন) বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা থেকে বিশ্বজুড়ে মেটা প্ল্যাটফর্মস ইনকরপোরেটেডের মালিকানাধীন এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমটি ব্যবহারে মারাত্মক সমস্যা দেখা দেয়। আকস্মিক এই বিভ্রাটের কারণে বিশ্বের লাখ লাখ ব্যবহারকারী চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। ফেসবুকের পাশাপাশি মেটার অন্যান্য জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম যেমন ইনস্টাগ্রাম, মেসেঞ্জার ও থ্রেডস ব্যবহারের ক্ষেত্রেও একই ধরনের জটিলতার খবর পাওয়া গেছে।
ব্যবহারকারীদের অভিযোগ, কম্পিউটার (ওয়েব সংস্করণ) কিংবা মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন—কোনো মাধ্যম দিয়েই ফেসবুকে প্রবেশ করা যাচ্ছে না। অনেক ব্যবহারকারী জানিয়েছেন, সচল থাকা অবস্থায় তাদের অ্যাকাউন্ট হঠাৎ করেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ‘লগআউট’ হয়ে গেছে। পরবর্তীতে পুনরায় লগইন করার চেষ্টা করা হলে ‘সেশন এক্সপায়ার্ড’ কিংবা ‘অ্যাকাউন্ট সাময়িকভাবে অনুপলব্ধ’ (অ্যাকাউন্ট টেম্পোরারিলি আনঅ্যাভেইলেবল) সংক্রান্ত বার্তা প্রদর্শন করছে। কোথাও কোথাও অ্যাপ খোলার পর শুধুমাত্র একটি খালি স্ক্রিন বা ‘সামথিং ওয়েন্ট রং’ লেখা ভেসে উঠছে।
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ত্রুটি ও বিভ্রাট নজরদারি করার আন্তর্জাতিক ওয়েবসাইট ‘ডাউনডিটেক্টর’-এর রিয়েল-টাইম পরিসংখ্যান অনুযায়ী, শুক্রবার বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যার পর থেকে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের সমস্যা নিয়ে বিশ্বব্যাপী হাজার হাজার ব্যবহারকারী রিপোর্ট করতে শুরু করেন। ডাউনডিটেক্টরের গ্রাফে দেখা যায়, বিঘ্ন ঘটার পর মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে বিশ্বজুড়ে অভিযোগের সংখ্যা লাখ ছাড়িয়ে যায়। বিভ্রাটের তীব্রতা এতই বেশি ছিল যে ব্যবহারকারীদের অতিরিক্ত ট্রাফিকের চাপে ডাউনডিটেক্টরের নিজস্ব পাতাও কিছু সময়ের জন্য ধীরগতির হয়ে পড়ে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ফেসবুক ব্যবহার করতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি জটিলতায় পড়েছেন ওয়েবসাইটের মাধ্যমে লগইন করতে চাওয়া গ্রাহকেরা। এছাড়া মোবাইল অ্যাপ ব্যবহারকারীরাও অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করতে গিয়ে ক্রমাগত পাসওয়ার্ড উইন্ডোর লুপের মুখোমুখি হচ্ছেন। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা গ্রাহকদের এই পরিস্থিতিতে বারবার পাসওয়ার্ড পরিবর্তনের চেষ্টা বা অ্যাকাউন্ট রিসেট রিকোয়েস্ট পাঠানো থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। কারণ এটি কোনো ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট হ্যাকিংয়ের ঘটনা নয়, বরং মেটার কেন্দ্রীয় ব্যাকএন্ড সার্ভারের অভ্যন্তরীণ ত্রুটির কারণে সৃষ্টি হয়েছে।
এই বিভ্রাট কেবল নির্দিষ্ট কোনো দেশ বা অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ এবং এশিয়াসহ বিশ্বের প্রায় সব দেশেই একযোগে এই বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশেও সন্ধ্যার পর থেকে ব্যবহারকারীরা তাৎক্ষণিকভাবে এই ভোগান্তির সম্মুখীন হন। মূল প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ করতে না পেরে কোটি কোটি ব্যবহারকারী বিকল্প যোগাযোগমাধ্যম হিসেবে পরিচিত মাইক্রোব্লগিং সাইট ‘এক্স’ (সাবেক টুইটার) এবং রেডিটে ভিড় জমাতে শুরু করেন। ইতিমধ্যে এক্সে ‘#FacebookDown’ এবং ‘#MetaOutage’ হ্যাশট্যাগ দুটি বিশ্বব্যাপী শীর্ষ ট্রেন্ডিংয়ে পরিণত হয়েছে। সেখানে ব্যবহারকারীরা তাদের স্ক্রিনশট শেয়ার করে বৈশ্বিক এই ভোগান্তির কথা তুলে ধরছেন।
ব্যবসায়িক এবং প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগে ফেসবুকের ওপর নির্ভরশীল ব্যবহারকারীরা এই বিভ্রাটের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বর্তমান যুগে ছোট-বড় অসংখ্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং অনলাইন ভিত্তিক পরিষেবা ফেসবুক পেজ ও মেসেঞ্জারের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়। ফলে সার্ভারের এই দীর্ঘস্থায়ী ডাউনটাইমের কারণে বিশ্বজুড়ে বড় ধরনের আর্থিক ও ব্যবসায়িক লেনদেন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মেটার নিজস্ব ব্যবসায়িক স্ট্যাটাস পেজে প্রাথমিক পর্যায়ে ‘কোনো সমস্যা নেই’ (নো নোন ইস্যুজ) দেখানো হলেও, বিশ্বজুড়ে ব্যাপক ব্যবহারকারী আক্রান্ত হওয়ার পর এটি যে একটি বড় ধরনের বৈশ্বিক কারিগরি ত্রুটি, তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তবে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও মেটা কর্তৃপক্ষ বা তাদের কোনো মুখপাত্রের পক্ষ থেকে এই বিভ্রাটের সুনির্দিষ্ট কারণ কিংবা কখন নাগাদ সেবা পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য বা ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি মেটার বৈশ্বিক সার্ভার কনফিগারেশন বা রাউটিংজনিত বড় কোনো ত্রুটির ফল হতে পারে।


