যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তি: মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী যুদ্ধবিরতির পথে নতুন দিগন্ত

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তি: মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী যুদ্ধবিরতির পথে নতুন দিগন্ত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

দীর্ঘদিন ধরে চলমান তীব্র সামরিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে একটি ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তিতে পৌঁছেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান। দুই দেশের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই সমঝোতার কথা জানানো হয়েছে। সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, উভয় পক্ষই অবিলম্বে সমস্ত ফ্রন্টে সামরিক অভিযান স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে সম্মত হয়েছে। বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা ও মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এই চুক্তি অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আজ সোমবার ভোররাতে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ দ্বিপাক্ষিক এই শান্তিচুক্তির ঘোষণা দেন। এর পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে ইরানের সঙ্গে চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছানোর বিষয়টি নিশ্চিত করেন। চুক্তি প্রক্রিয়া সফল করতে কাতার, সৌদি আরব ও তুরস্ক গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সহায়তা প্রদান করেছে। আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে দুই দেশের মধ্যে এই ঐতিহাসিক চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা রয়েছে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর বরাত দিয়ে জানা গেছে, এই সমঝোতা স্মারকে মোট ১৪টি মূল বিষয় বা শর্ত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। যার মধ্যে অন্যতম হলো—লেবাননসহ সমস্ত ফ্রন্টে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা, ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ না করার প্রতিশ্রুতি এবং আগামী ৩০ দিনের মধ্যে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর আরোপিত মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করা। এ ছাড়া চুক্তি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ইরান থেকে মার্কিন সামরিক বাহিনী প্রত্যাহার এবং আগামী ৩০ দিনের মধ্যে ইরানের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

চুক্তির অন্যান্য শর্তের মধ্যে রয়েছে—ইরানের তেল ও জ্বালানি খাতের ওপর থাকা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং পূর্বের জব্দকৃত ইরানি তহবিলের অবমুক্তি। এর বিপরীতে ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি শান্তিপূর্ণ রাখার এবং কোনো ধরনের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে। মার্কিন প্রশাসনও এই অঞ্চলে নতুন করে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি না করার বা কোনো অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ না করার আশ্বাস দিয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে এই দ্বিপাক্ষিক চুক্তিটি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবের মাধ্যমে অনুমোদিত ও আন্তর্জাতিকভাবে বৈধতা পাবে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার বিবৃতিতে জানান, চুক্তি স্বাক্ষরের পরপরই হরমুজ প্রণালি মাইনমুক্ত করে সম্পূর্ণ টোলমুক্তভাবে চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হবে। তিনি বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করতে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে অবিলম্বে তাদের কার্যক্রম শুরুর আহ্বান জানান। ট্রাম্প এই চুক্তিকে এই অঞ্চলের দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য একটি ঐতিহাসিক সাফল্য হিসেবে অবিহিত করেছেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সতর্ক করা হয়েছে যে, ইরান যদি পরবর্তীতে পারমাণবিক বা অন্যান্য কৌশলগত শর্ত লঙ্ঘনে লিপ্ত হয়, তবে স্থগিতকৃত সামরিক বা অর্থনৈতিক পদক্ষেপ পুনরায় চালু করা হতে পারে। এদিকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, চুক্তিটি স্বাক্ষরের পর আগামী ৬০ দিন ধরে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও এর বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ সংক্রান্ত কারিগরি আলোচনা অব্যাহত থাকবে।

দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে ইরানের কট্টর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে পরিচিত ইসরায়েল এই চুক্তিকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করছে না। দেশটির অভ্যন্তরীণ ডানপন্থি রাজনৈতিক মহল ও নীতিনির্ধারকদের একাংশ মার্কিন প্রশাসনের এই আকস্মিক সিদ্ধান্তকে তাদের জন্য একটি ‘কৌশলগত পরাজয়’ হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে লেবাননে চলমান সামরিক অভিযান বন্ধের বাধ্যবাধকতা এবং তেহরানের ওপর থেকে মার্কিন চাপ হ্রাস পাওয়ার বিষয়টিকে ইসরায়েলি কট্টরপন্থিরা রাজনৈতিকভাবে মেনে নিতে পারছেন না। এর ফলে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের দীর্ঘদিনের অভিন্ন কৌশলগত অবস্থানে এক ধরনের দৃশ্যমান দূরত্ব তৈরি হতে পারে, যা সমগ্র মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা সমীকরণকে সম্পূর্ণ নতুন রূপ দিতে যাচ্ছে।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ