অর্থ ও বাণিজ্য ডেস্ক
বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্টে প্রতি বছর প্রায় ১৫৬ কোটি টাকার আর্থিক ঘাটতি তৈরি হচ্ছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলন। এই বিপুল পরিমাণ ঘাটতির কারণে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের কল্যাণ সুবিধা ও অন্যান্য প্রাপ্য অর্থ যথাসময়ে পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে না এবং প্রক্রিয়াটি দীর্ঘায়িত হচ্ছে।
রবিবার (১৪ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় এবং প্রথম বাজেট অধিবেশনের ষষ্ঠ কার্যদিবসে এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী এই তথ্য সংসদকে জানান। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। যশোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. গোলাম রছুলের তারকা চিহ্নিত প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী ট্রাস্টের বর্তমান আর্থিক সংকট, অনিষ্পন্ন আবেদনের সংখ্যা এবং এই সংকট নিরসনে সরকারের গৃহীত নানা পদক্ষেপের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেন।
সংসদে উত্থাপিত তথ্যানুযায়ী, ‘বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শিক্ষক-কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট আইন, ১৯৯০’ এবং ‘প্রবিধানমালা, ১৯৯৯’ অনুযায়ী এই ট্রাস্টটি পরিচালিত হয়ে আসছে। বর্তমানে ট্রাস্টের প্রধান আয়ের উৎস হলো এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের মাসিক মূল বেতন থেকে কর্তনকৃত ৪ শতাংশ চাঁদা এবং ট্রাস্টের নিজস্ব বিনিয়োগ থেকে প্রাপ্ত মুনাফা। এই দুই উৎস থেকে কল্যাণ ট্রাস্টের বার্ষিক মোট আয় হয় প্রায় ৬৮৪ কোটি টাকা। তবে এর বিপরীতে প্রতি বছর অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের কল্যাণ সুবিধা প্রদানের জন্য প্রয়োজন হয় প্রায় ৮৪০ কোটি টাকা। ফলে প্রতি বছরই ট্রাস্টকে প্রায় ১৫৬ কোটি টাকার ঘাটতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এর পাশাপাশি এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের মূল বেতনের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি (ইনক্রিমেন্ট) হওয়ার কারণে ট্রাস্টের সামগ্রিক আর্থিক দায়ও ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে।
আর্থিক সংকটের প্রত্যক্ষ প্রভাবে বিপুল সংখ্যক অবসরকালীন সুবিধা প্রাপ্তির আবেদন বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী জানান, ২০২৩ সালের ৮ আগস্ট থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত জমাকৃত অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রায় ৪৪ হাজার কল্যাণ সুবিধার আবেদন বর্তমানে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। এই বিশাল সংখ্যক অনিষ্পন্ন আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হলে এই মুহূর্তে এককালীন প্রায় ৩ হাজার ১৫০ কোটি টাকার অতিরিক্ত অর্থ প্রয়োজন। সরকার এই প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান এবং আবেদনগুলো দ্রুততম সময়ের মধ্যে নিষ্পত্তির বিষয়ে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।
তহবিল সংকট সত্ত্বেও সরকার ও কল্যাণ ট্রাস্টের পক্ষ থেকে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রাপ্য সুবিধা দ্রুত প্রদানের লক্ষ্যে বিভিন্ন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। মন্ত্রী জানান, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ইতোমধ্যে ৯ হাজার ২৮৪ জন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীর অনুকূলে ৫৫৩ কোটি ৬৩ লাখ ৩৫ হাজার ৮৭৪ টাকা কল্যাণ সুবিধা প্রদান করা হয়েছে।
এ ছাড়া, ২০২৩ সালের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত জমা পড়া সব আবেদন সম্পূর্ণভাবে নিষ্পত্তি করা হয়েছে এবং ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থা ‘আইবাস প্লাস প্লাস’ (iBAS++)-এর মাধ্যমে সুবিধাভোগীদের নিজস্ব ব্যাংক হিসাবে সরাসরি অর্থ পাঠানো হয়েছে। এর পরবর্তী ধাপ হিসেবে ২০২৩ সালের জুন ও জুলাই মাসে জমাকৃত আবেদনগুলোর যাচাই-বাছাই ও নিষ্পত্তি সম্পন্ন করে সংশ্লিষ্টদের অর্থ পরিশোধের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে বলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছেন, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসরকালীন সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই কল্যাণ ট্রাস্টের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতি বছরের এই স্থায়ী ঘাটতি দূর করতে এবং ৪৪ হাজার শিক্ষকের দীর্ঘদিনের বকেয়া পরিশোধে সরকারের এককালীন বিশেষ বরাদ্দ প্রদান কিংবা ট্রাস্টের আয়ের নতুন উৎস সন্ধান করা জরুরি হয়ে পড়েছে। অন্যথায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকদের দীর্ঘসূত্রতা ও ভোগান্তি আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।


