আনোয়ারায় দেশের প্রথম মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব অনুমোদন

আনোয়ারায় দেশের প্রথম মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব অনুমোদন

অর্থ ও বাণিজ্য ডেস্ক

চট্টগ্রামের আনোয়ারায় দেশের প্রথম মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল বা ফ্রি ট্রেড জোন (এফটিজেড) প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিপরিষদ কমিটি (সিসিইএ)। গত ১৭ জুন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সিসিইএর বৈঠকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এই নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়। এই উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশের বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিচালনা ও আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আকর্ষণে এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে। বেজা সূত্রে জানা যায়, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে দেশে একটি আধুনিক ও কার্যকর মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দীর্ঘদিন ধরে প্রক্রিয়া চলমান ছিল। এ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয়, অর্থ বিভাগ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট ১০টি সরকারি সংস্থার প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়।

উক্ত উচ্চপর্যায়ের কমিটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সফল ফ্রি ট্রেড জোন পরিচালনা ব্যবস্থা, বিদ্যমান আইন, নীতিমালা, প্রণোদনা কাঠামো এবং পরিচালন মডেল নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা করে একটি বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রস্তুত করে। সেই প্রতিবেদনের সুপারিশের ভিত্তিতে অবকাঠামোগত সুবিধা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংযোগ, লজিস্টিক সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের সম্ভাবনা বিবেচনায় কর্ণফুলী নদীর তীরবর্তী আনোয়ারা উপজেলাকে দেশের প্রথম ফ্রি ট্রেড জোন স্থাপনের জন্য উপযুক্ত স্থান হিসেবে নির্বাচন করা হয়। এর আগে চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি বেজার গভর্নিং বোর্ডের নবম সভায় দেশের প্রথম ফ্রি ট্রেড জোন স্থাপনের বিষয়টি নীতিগতভাবে অনুমোদিত হয়েছিল।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রস্তাবিত ফ্রি ট্রেড জোনটি পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও সরবরাহ শৃঙ্খল (সাপ্লাই চেইন) ব্যবস্থাপনায় আমূল পরিবর্তন আসবে। এটি সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণ, রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ, আন্তর্জাতিক মানের লজিস্টিক হাব গড়ে তোলা এবং ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সুদূরপ্রসারী ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে চট্টগ্রামের ভৌগোলিক অবস্থান এবং সমুদ্রবন্দরের নিকটবর্তী হওয়ায় এই অঞ্চলটি আঞ্চলিক বাণিজ্যের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) এবং বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী এই উদ্যোগের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, বাংলাদেশ এখন ফ্রি ট্রেড জোন মডেলে প্রবেশ করার জন্য অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগতভাবে উপযুক্ত সময় অতিক্রম করছে। দেশের লজিস্টিক সক্ষমতা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে বাংলাদেশকে আঞ্চলিক গুদামজাতকরণ এবং বাণিজ্যিক হাব হিসেবে ব্যবহারের একটি বড় সুযোগ তৈরি হয়েছে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে রপ্তানি খাতকে দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে একটি সুনির্দিষ্ট ফ্রি ট্রেড জোন প্রতিষ্ঠা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার জন্য একটি স্বাভাবিক ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ। বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত ও উদীয়মান অর্থনীতি, যেমন—দুবাই, চীনসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশে এই মডেল সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে। বাংলাদেশও সেই সফল মডেলগুলো অনুসরণ করে নিজস্ব অর্থনীতির পরিধি আরও বিস্তৃত করতে চায়।

তবে এই মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলকে পুরোপুরি কার্যকর ও আন্তর্জাতিক মানের করতে আইনি ও প্রশাসনিক কিছু সংস্কার প্রয়োজন বলে জানা গেছে। নির্বাহী চেয়ারম্যান জানান, ফ্রি ট্রেড জোনের কার্যক্রম সুচারুভাবে পরিচালনার জন্য ইতিমধ্যে বাজেটে কিছু প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনা হয়েছে এবং আমদানি নীতি আদেশেও পরিবর্তন করা হয়েছে। তবে এর পূর্ণাঙ্গ সুবিধা নিশ্চিত করতে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আইনি সুরক্ষা ও বাণিজ্যিক সুবিধা দিতে আরও কয়েকটি বিদ্যমান আইন ও বিধিমালায় প্রয়োজনীয় সংশোধন ও পরিমার্জন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। আইনি এই সংস্কারগুলো দ্রুত সম্পন্ন হলে দেশের প্রথম ফ্রি ট্রেড জোন প্রতিষ্ঠার কাজ আরও গতিশীল হবে।

অর্থ বাণিজ্য শীর্ষ সংবাদ