অপরাধ ডেস্ক
অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে প্লট আত্মসাতের অভিযোগে দায়ের করা পৃথক দুই মামলায় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেছেন আদালত।
আজ মঙ্গলবার ঢাকার মেট্রোপলিটন সিনিয়র স্পেশাল জজ সাব্বির ফয়েজ উভয় পক্ষের শুনানি শেষে এই আদেশ দেন। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রসিকিউটর তরিকুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
আদালত সূত্রে জানা যায়, আজ মামলার নির্ধারিত কার্যদিবসে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা জামিনের আবেদন পেশ করেন। অন্যদিকে দুদকের পক্ষ থেকে এই জামিন আবেদনের তীব্র বিরোধিতা করা হয়। দুদক প্রসিকিউশন আদালতকে জানায়, আসামির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর এবং মামলার তদন্তের স্বার্থে এই মুহূর্তে তাকে জামিন দেওয়া সমীচীন হবে না। উভয় পক্ষের যুক্তি ও আইনি ব্যাখ্যা পর্যালোচনা করে আদালত আসামির জামিন আবেদন নাকচ করার সিদ্ধান্ত নেন।
মামলার বিবরণী থেকে জানা যায়, গত বছরের ১১ সেপ্টেম্বর দুর্নীতি দমন কমিশনের উপ-সহকারী পরিচালক পাপন কুমার শাহ বাদী হয়ে সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১-এ বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের প্রথম মামলাটি দায়ের করেন।
এই মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, বিচারপতি হিসেবে কর্মরত থাকাকালীন তিনি নিজের পদের ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে অসাধু উপায়ে জ্ঞাত আয়ের উৎসের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ ৫ কোটি ৩৯ লাখ ৬৬ হাজার ৮২০ টাকার স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ অর্জন করেছেন। শুধু তাই নয়, এই অবৈধ আয়ের উৎস গোপন করার উদ্দেশ্যে তিনি উক্ত অর্থ ও সম্পদ বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় হস্তান্তর, রূপান্তর এবং স্থানান্তরের মাধ্যমে বিদেশে পাচার করেছেন, যা মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ।
এর পাশাপাশি, একই দিনে (১১ সেপ্টেম্বর) রাজউকের প্লট আত্মসাতের অভিযোগে সংস্থাটির অপর উপ-সহকারী পরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন বাদী হয়ে দ্বিতীয় মামলাটি দায়ের করেন। এই মামলায় অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মানিকসহ মোট আটজনকে আসামি করা হয়েছে।
দ্বিতীয় মামলার এজাহারের তথ্য অনুযায়ী, আসামিরা পরস্পরের যোগসাজশে ক্ষমতার অপব্যবহার, জালিয়াতি, প্রতারণা এবং মিথ্যা হলফনামা দাখিলের মাধ্যমে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে একটি মূল্যবান প্লট বরাদ্দ নেন। পরবর্তীতে তারা সরকারি লিজ দলিলের মূল শর্তাবলি লঙ্ঘন করে বেআইনিভাবে উক্ত প্লটটি হস্তান্তর ও আত্মসাৎ করেন।
দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) প্রচলিত নিয়ম ও নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির যদি রাজউক অধিক্ষেত্রে পূর্বে কোনো বাড়ি, ফ্ল্যাট বা জমি থাকে, তবে তিনি বা তার পরিবারের কোনো সদস্য নতুন কোনো প্লট বরাদ্দের জন্য যোগ্য বিবেচিত হবেন না। এই নিয়ম নিশ্চিত করার জন্য প্রত্যেক আবেদনকারীকে প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক সত্যায়িত একটি হলফনামা জমা দিতে হয়। যেখানে উল্লেখ থাকে যে, আবেদনকারী বা তার ওপর নির্ভরশীল অন্য কেউ রাজউক এলাকায় কোনো জমি, ফ্ল্যাট বা বাড়ির মালিক নন।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকের ঢাকার বাড্ডা থানার ভাটারা মৌজায় পৈতৃক ও ক্রয়সূত্রে প্রাপ্ত জমি এবং একটি নির্মাণাধীন বহুতল বাড়ি থাকা সত্ত্বেও তিনি হলফনামায় সম্পূর্ণ অসত্য তথ্য প্রদান করেন। পরবর্তীতে তিনি রাজউকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ওপর প্রভাব বিস্তার করে পূর্বাচল প্রকল্পের ওই প্লটটি নিজের নামে রেজিস্ট্রি বা নিবন্ধন করিয়ে নেন।
সংশ্লিষ্ট আইনি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশের উচ্চ আদালতের একজন সাবেক বিচারপতির বিরুদ্ধে এ ধরনের গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগ এবং জামিন প্রত্যাখ্যানের ঘটনা বিচার বিভাগের ভাবমূর্তি এবং সুশাসনের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। দুদক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মামলা দুটির তদন্ত কার্যক্রম বর্তমানে শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং দ্রুতই আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করা হবে।


