আন্তর্জাতিক ডেস্ক
সম্ভাব্য বহিরাগত আগ্রাসন ও নিরাপত্তার হুমকির মুখে নিজেদের কৌশলগত পারমাণবিক সক্ষমতা যাচাইয়ে তিন দিনব্যাপী এক ব্যাপকভিত্তিক সামরিক মহড়া শুরু করেছে রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনী। মঙ্গলবার (১৯ মে) থেকে শুরু হওয়া এই দেশব্যাপী পারমাণবিক মহড়ায় দেশটির স্থল, আকাশ ও নৌবাহিনীর হাজার হাজার সেনা সদস্য একযোগে অংশ নিচ্ছেন। আগামী ২১ মে পর্যন্ত এই কার্যক্রম চলমান থাকবে বলে রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে।
ইউক্রেনীয় বাহিনীর ড্রোন হামলা জোরদার এবং রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের চীন সফরের উদ্দেশ্যে রওনা হওয়ার ঠিক পূর্বমুহূর্তে ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে এই বিশেষ সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হলো। ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, চলমান বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক উত্তেজনার মধ্যে এই মহড়া মূলত পশ্চিমা বিশ্বের প্রতি মস্কোর এক ধরনের কৌশলগত বার্তা।
রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ১৯ থেকে ২১ মে পর্যন্ত রুশ সশস্ত্র বাহিনী সম্ভাব্য আগ্রাসনের হুমকির পরিস্থিতিতে পারমাণবিক বাহিনীর সর্বাত্মক প্রস্তুতি ও ব্যবহার বিষয়ক একটি বিশেষ মহড়া পরিচালনা করছে। মূলত শত্রুভাবাপন্ন কোনো পক্ষের আকস্মিক আক্রমণের পরিস্থিতিতে রাশিয়ার পারমাণবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা কতটা কার্যকর ও দ্রুত সাড়া দিতে প্রস্তুত, তা মাঠপর্যায়ে পরীক্ষা করাই এই মহড়ার মূল লক্ষ্য।
এবারের তিন দিনব্যাপী এই মহড়াটি পূর্বের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি ব্যাপক এবং তাৎপর্যপূর্ণ। প্রতিরক্ষা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, মহড়াটিতে রাশিয়ার পারমাণবিক ট্রায়াড অর্থাৎ—স্থলভিত্তিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, সাবমেরিন থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র এবং কৌশলগত বোমারু বিমান—এই তিনটি প্রধান উপাদানই একযোগে অংশ নিচ্ছে। সামরিক মহড়ায় প্রায় ৬৪ হাজারেরও বেশি সেনা সদস্য এবং ৭ হাজার ৮০০-এর অধিক অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জাম ও যানবাহন ব্যবহার করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে ২০০টিরও বেশি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা (লঞ্চার), ১৪০টির বেশি যুদ্ধবিমান এবং কৌশলগত পারমাণবিক সাবমেরিনসহ ৭৩টি যুদ্ধজাহাজ। মহড়ার অংশ হিসেবে দূরপাল্লার ক্রুজ ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ সম্পন্ন করা হবে বলে জানা গেছে।
একই সাথে এই মহড়ায় রাশিয়ার অন্যতম মিত্র দেশ বেলারুশের ভূখণ্ডে মোতায়েনকৃত রুশ কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্রের যৌথ ব্যবহারের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। বেলারুশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ও রাশিয়ার সাথে সমন্বয় রেখে তাদের নিজস্ব ইউনিটের প্রস্তুতি পরীক্ষা করার কথা জানিয়েছে। ফলে এই মহড়াটি কেবল রাশিয়ার অভ্যন্তরেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর সীমান্তবর্তী অঞ্চলেও এক ধরনের সামরিক সতর্কবার্তা তৈরি করেছে।
আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই পারমাণবিক মহড়াকে অত্যন্ত সংবেদনশীল হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে গত ফেব্রুয়ারি মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যকার সর্বশেষ পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি ‘নিউ স্টার্ট’ (New START)-এর মেয়াদ আনুষ্ঠানিকভাবে ভেঙে যাওয়ার পর এটিই রাশিয়ার প্রথম এত বড় পারমাণবিক শক্তির প্রদর্শন। এই চুক্তিটি বাতিলের ফলে দুই পরাশক্তির পারমাণবিক অস্ত্রাগারের ওপর থাকা সমস্ত বৈশ্বিক আইনি বিধিনিষেধ উঠে গেছে, যা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মহলকে গভীর উদ্বেগে ফেলেছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইউক্রেন সংকটের শুরু থেকেই ক্রেমলিন বিভিন্ন সময়ে পশ্চিমা বিশ্বকে সতর্ক করতে পারমাণবিক শক্তির প্রসঙ্গটি সামনে এনেছে। চলমান পরিস্থিতিতে একদিকে ইউক্রেনের পাল্টা ড্রোন আক্রমণ প্রতিহত করা, অন্যদিকে বেইজিংয়ের সাথে অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক আরও জোরদার করতে পুতিনের চীন সফরের প্রাক্কালে এই মহড়া পরিচালনার মাধ্যমে রাশিয়া তার বিশ্বস্ত প্রতিরক্ষা অবস্থান এবং সামরিক সক্ষমতার জানান দিতে চাইছে। আগামী তিন দিন উত্তর মহাসাগরের বেরেন্টস সাগরসহ রাশিয়ার বিভিন্ন সামরিক জোনে এই উচ্চপর্যায়ের মহড়া ও ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা অব্যাহত থাকবে।


