মিরপুরে শিশু গৃহকর্মী মাইমুনাকে নির্যাতন চালিয়ে হত্যার অভিযোগ, আইনজীবী ও প্রকৌশলী দম্পতি আটক

মিরপুরে শিশু গৃহকর্মী মাইমুনাকে নির্যাতন চালিয়ে হত্যার অভিযোগ, আইনজীবী ও প্রকৌশলী দম্পতি আটক

অপরাধ ডেস্ক

রাজধানীর মিরপুরে মোছা. মাইমুনা (১০) নামের এক শিশু গৃহকর্মীকে বেধড়ক নির্যাতন চালিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। নির্যাতনের পর ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার উদ্দেশ্যে তাকে উত্তরার একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক ওই শিশুকে মৃত ঘোষণা করেন। এই হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে জড়িত থাকার দায়ে গৃহকর্তা মোহাম্মদ আবরার ফাইয়াজ (৩৪) ও তার স্ত্রী মেহনাজ অনন্যা (৩৪)-কে আটক করেছে পুলিশ। আটককৃত আবরার ফাইয়াজ পেশায় একজন তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) প্রকৌশলী এবং তার স্ত্রী মেহনাজ অনন্যা একজন আইনজীবী।

পুলিশ ও নিহতের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, নিহত মাইমুনা ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার কালিসীমা গ্রামের ফুল মিয়ার মেয়ে। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে সে ছিল দ্বিতীয়। গত প্রায় আড়াই বছর ধরে মিরপুর-২ নম্বরের জি-ব্লকের ১৮ নম্বর সড়কের একটি বাসায় ওই দম্পতির অধীনে গৃহকর্মীর কাজ করছিল মাইমুনা। দীর্ঘ এই সময় জুড়ে তাকে অনাহারে রাখা এবং পর্যায়ক্রমিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হতো বলে প্রাথমিক তদন্ত ও স্বজনদের অভিযোগে জানা গেছে।

মঙ্গলবার (১৯ মে) বিকেল ৪টার দিকে উত্তরা ১৩ নম্বর সেক্টরের গাউসুল আজম এভিনিউ সংলগ্ন ঢাকা স্পেশালাইজড হাসপাতালে মাইমুনাকে নিয়ে যাওয়া হয়। হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসকরা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানান, হাসপাতালে আনার আগেই শিশুটির মৃত্যু হয়েছে। খবর পেয়ে উত্তরা পশ্চিম থানা পুলিশ হাসপাতাল থেকে অভিযুক্ত দম্পতিকে আটক করে। পরে ঘটনাস্থল মিরপুর থানা এলাকায় হওয়ায় বুধবার (২০ মে) সকালে তাদের মিরপুর মডেল থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

নিহত গৃহকর্মীর মা বিউটি আক্তার ওরফে সালমা অভিযোগ করেন, আড়াই বছর আগে এক মধ্যস্থতাকারী নারীর মাধ্যমে মাইমুনাকে ওই বাসায় কাজে দেওয়া হয়েছিল। এরপর থেকে গৃহকর্তা ও গৃহকর্ত্রী মাইমুনার পরিবারের সঙ্গে সমস্ত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। দীর্ঘ আড়াই বছর ধরে বারবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও মায়ের সাথে মেয়েকে দেখা করতে দেওয়া হয়নি, এমনকি তাদের বাসার ঠিকানাও গোপন রাখা হয়েছিল। তিনি আরও জানান, আড়াই বছর আগে সুস্থ-সবল অবস্থায় কাজে যাওয়া মাইমুনার মরদেহ অত্যন্ত রুগ্ন এবং সারা শরীরে গভীর ক্ষত ও আঘাতের চিহ্নে ভরা ছিল।

অভিযোগ উঠেছে, নির্যাতনের ফলে মাইমুনার মৃত্যুর পর বিষয়টি সম্পূর্ণ গোপন রাখার একটি সুপরিকল্পিত চেষ্টা করা হয়েছিল। গৃহকর্তা আবরার ফাইয়াজের বন্ধু ডা. মুনতাসির মাহমুদ ইভান পূর্বে ঢাকা স্পেশালাইজড হাসপাতালে কর্মরত ছিলেন এবং বর্তমানে উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আছেন। অভিযোগ রয়েছে, এই চিকিৎসকের পরামর্শ ও প্রত্যক্ষ সহায়তায় আইনি জটিলতা এড়াতে মাইমুনাকে ঢাকা স্পেশালাইজড হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়।

হাসপাতালের সহকারী ম্যানেজার আমিনুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে জানান, ডা. ইভানের মাধ্যমেই শিশুটিকে তাদের হাসপাতালে আনা হয়েছিল, তবে হাসপাতালে পৌঁছানোর পূর্বেই তার মৃত্যু ঘটে। চিকিৎসকের সংশ্লিষ্টতা এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের পুলিশকে সময়মতো না জানানোর বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে প্রশ্ন উঠেছে।

ঘটনার পর পর হাসপাতাল প্রাঙ্গণে অভিযুক্ত পক্ষ ভুক্তভোগী পরিবার ও মধ্যস্থতাকারীদের সাথে আড়াই লাখ টাকার বিনিময়ে বিষয়টি আপস-মীমাংসার চেষ্টা চালায়। কিন্তু একপর্যায়ে আর্থিক লেনদেন ও বণ্টন নিয়ে উপস্থিত ব্যক্তিদের মধ্যে তীব্র দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হলে বিষয়টি স্থানীয় জনতা টের পেয়ে যায়। পরবর্তীতে স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয় এবং অভিযুক্তদের আটক করে।

উত্তরা পশ্চিম থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আবু সাঈদ জানান, সুরতহাল প্রতিবেদনে শিশুটির শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর ও স্পষ্ট আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। প্রাথমিক আলামতে এটি একটি পরিকল্পিত নির্যাতনজনিত হত্যাকাণ্ড বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। অপরাধের মূল ঘটনাস্থল মিরপুর এলাকায় হওয়ায় আটককৃতদের মিরপুর মডেল থানায় সোপর্দ করা হয়েছে এবং সেখানে একটি হত্যা মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পেছনে সুনির্দিষ্ট কারণ এবং অন্য কারও প্ররোচনা বা সহযোগিতা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে পুলিশি তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।

রাজধানী শীর্ষ সংবাদ