অর্থ-বাণিজ্য ডেস্ক
জাতীয় অর্থনীতি ও জনস্বাস্থ্যের সামগ্রিক উন্নয়নের লক্ষ্যে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের জন্য মোট ৬২ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এটি বিগত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় ২০ হাজার ৯৪৪ কোটি টাকা বেশি। বিগত অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ৩৪ হাজার ৭৯৮ কোটি টাকা। প্রস্তাবিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেটে স্বাস্থ্য খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হলেও সার্বিক রাজস্ব ঘাটতি মেটাতে সরকারকে বড় ধরনের ঋণের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
বাজেট বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, স্বাস্থ্য খাতকে মূলত দুটি প্রধান বিভাগে ভাগ করে এই বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ‘স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ’ এর জন্য বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৯ হাজার ৩৮৬ কোটি টাকা। এই বরাদ্দ আগের বছরের সংশোধিত বাজেট (২১ হাজার ৯৩৩ কোটি টাকা) এবং মূল বাজেটের (১৪ Freak ৭৬৩ কোটি টাকা) চেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেশি। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের মোট বরাদ্দের মধ্যে উন্নয়ন খাতেই রাখা হয়েছে ২৬ হাজার ৮০৫ কোটি টাকা।
অন্যদিকে, ‘স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ’ এর জন্য প্রস্তাবিত বাজেটে ১৩ হাজার ৪৬৬ কোটি টাকা বরাদ্দ ধরা হয়েছে। এই বিভাগের বরাদ্দও বিগত অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের (৬ হাজার ১২১ কোটি টাকা) এবং মূল বাজেটের (৪ হাজার ২৬৮ কোটি টাকা) তুলনায় অনেক বাড়ানো হয়েছে। স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের উন্নয়ন খাতের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৮ হাজার ২২১ কোটি টাকা।
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, নতুন অর্থবছরে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগে এডিপি বরাদ্দ ধরা হয়েছে ২৬ হাজার ৮০৬ কোটি টাকা। খাতটির বিগত বছরগুলোর ব্যয় এবং বরাদ্দ সংশোধনের চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এ বিভাগে প্রকৃত ব্যয় ছিল মাত্র ২ হাজার ১ কোটি টাকা। আবার ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মূল বাজেটে ১১ হাজার ৬১৭ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও পরবর্তী সময়ে সংশোধিত বাজেটে তা ব্যাপকভাবে কমিয়ে ৩ হাজার ১১৮ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছিল।
অনুরূপভাবে, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগে নতুন অর্থবছরের জন্য এডিপি বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৮ হাজার ২২১ কোটি টাকা। এই বিভাগেও ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রকৃত ব্যয় ছিল মাত্র ৪১২ কোটি টাকা। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মূল বাজেটে ৫ হাজার ৯৩২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও সংশোধিত বাজেটে তা ১ হাজার ৩৪৬ কোটি টাকায় নেমে আসে। আগামী অর্থবছরের জন্য এই দুই বিভাগের সম্মিলিত এডিপি বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৩৫ হাজার ২৬ কোটি টাকা। বিগত বছরগুলোতে বরাদ্দকৃত অর্থ সম্পূর্ণ ব্যয়ে সক্ষমতা না থাকা এবং বছর শেষে সংশোধিত বাজেটে বরাদ্দ কমিয়ে আনার যে প্রবণতা দেখা গেছে, তা কাটিয়ে নতুন অর্থবছরে এই বিশাল উন্নয়ন বরাদ্দ বাস্তবায়ন করাই এখন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
এদিকে, ঘোষিত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মোট প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এই বিশাল ব্যয়ের বিপরীতে সরকারের মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে সামগ্রিক বাজেটে আয় ও ব্যয়ের মধ্যে মোট ব্যবধান বা ঘাটতি দাঁড়াচ্ছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাজেটের এই বিশাল ঘাটতি মেটানো এবং স্বাস্থ্য খাতের মতো জনকল্যাণমূলক খাতে বর্ধিত বরাদ্দের জোগান নিশ্চিত করতে সরকারকে অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ব্যবস্থা এবং বৈদেশিক উৎস—উভয় খাত থেকেই বিপুল পরিমাণ অর্থ ঋণ হিসেবে সংগ্রহ করতে হবে। অভ্যন্তরীণ ব্যাংক খাত থেকে অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণের ফলে দেশের বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি থাকে, যা সামগ্রিক বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে স্বাস্থ্য খাতের এই বর্ধিত বরাদ্দ যদি সঠিকভাবে এবং সময়মতো বাস্তবায়ন করা যায়, তবে তা দেশের চিকিৎসাসেবার গুণগত মান বৃদ্ধি এবং টিকাদান ও পরিবার পরিকল্পনার মতো মৌলিক কর্মসূচিগুলোকে আরও বেগবান করবে।


