অর্থ ও বাণিজ্য ডেস্ক
রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও যানজট নিরসনে ঢাকার দুটি পাতাল মেট্রোরেল প্রকল্পের নির্মাণকাজ দ্রুত এগিয়ে নিতে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) ১১ হাজার ২৬০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। নতুন সরকারের প্রথম বাজেটে এই মেগা প্রকল্প দুটির সম্প্রসারণে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, দেশের প্রথম পাতাল রেল প্রকল্প এমআরটি লাইন-১ (বিমানবন্দর-কমলাপুর এবং নতুন বাজার-পূর্বাচল) এর জন্য ৭ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হচ্ছে। চলতি অর্থবছরে (২০২৫-২৬) এই প্রকল্পের সংশোধিত বরাদ্দ ছিল ৮০১ কোটি টাকা। ফলে নতুন বাজেটে এর বরাদ্দ বৃদ্ধি পাচ্ছে প্রায় নয় গুণ। অন্যদিকে, এমআরটি লাইন-৫ (নর্দান রুট: হেমায়েতপুর-ভাটারা) প্রকল্পের জন্য ৩ হাজার ৯১০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হয়েছে, যা চলতি অর্থবছরের ৮৬৩ কোটি টাকার বরাদ্দের তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ বেশি।
ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) জানায়, এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পের আওতায় পিতলগঞ্জ ডিপোর ভূমি উন্নয়ন এবং বিমানবন্দর পর্যন্ত ইউটিলিটি লাইন স্থানান্তরের কাজ শেষ হয়েছে। ২০৩০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে সম্পন্ন করার লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া এই প্রকল্পে গত অর্থবছর পর্যন্ত ৩ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। অপরদিকে, ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এমআরটি লাইন-৫ (নর্দান রুট) প্রকল্পের ডিজাইন ও জরিপ শেষ হয়েছে। হেমায়েতপুর ডিপোর জমি অধিগ্রহণ শেষে ভূমি উন্নয়নকাজের অগ্রগতি এখন ৮২ শতাংশের বেশি। ১০টি কন্ট্রাক্ট প্যাকেজের মধ্যে কয়েকটির দরপত্র মূল্যায়ন ও ঠিকাদার নিয়োগ প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
প্রকল্পের গতিশীলতা প্রসঙ্গে এমআরটি লাইন-৫ (নর্দান রুট)-এর প্রকল্প পরিচালক আব্দুল মতিন চৌধুরী জানান, অতীতে বিভিন্ন সিদ্ধান্তহীনতার কারণে কাজের গতি কিছুটা ধীর থাকলেও বর্তমান সরকারের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনায় প্রকল্পগুলোর গতি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ডিপোর ভূমি উন্নয়নকাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে এবং বাকি প্যাকেজগুলোর দরপত্র প্রক্রিয়া চূড়ান্ত মূল্যায়নের বিভিন্ন ধাপে রয়েছে।
তবে বরাদ্দের এই বিপুল উল্লম্ফনের পাশাপাশি প্রকল্প দুটির নির্মাণ ব্যয় নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ডিএমটিসিএলের প্রাক্কলন অনুযায়ী, এমআরটি লাইন-১ এর অনুমোদিত ব্যয় ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা হলেও আন্তর্জাতিক ঠিকাদারদের সর্বনিম্ন দরপ্রস্তাব অনুযায়ী তা প্রায় ৯৭ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। একইভাবে, ৪১ হাজার ২৩৮ কোটি টাকা ব্যয়ের এমআরটি লাইন-৫ প্রকল্পের ব্যয়ও প্রায় দ্বিগুণ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কর্মকর্তাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, চূড়ান্ত পর্যায়ে দুই প্রকল্পের সম্মিলিত ব্যয় প্রাক্কলিত বাজেটের দ্বিগুণ হয়ে প্রায় ২ লাখ কোটি টাকায় ঠেকতে পারে।
ব্যয় বৃদ্ধির এই প্রবণতা ও দরপত্র প্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. সামছুল হক জানান, কিছু উন্নয়ন অংশীদারের ঋণচুক্তির শর্তের কারণে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র আহ্বান এবং স্বচ্ছ মূল্য নির্ধারণের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ছে। পুনঃদরপত্র আহ্বান বা মূল্য আলোচনার (নেগোশিয়েশন) সুযোগ না থাকায় সরকারকে উন্নয়ন সহযোগীদের নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যেই সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে, যা প্রকল্প দুটির ব্যয় নিয়ন্ত্রণকে অত্যন্ত জটিল করে তুলেছে।


