আন্তর্জাতিক ডেস্ক
কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির ওমান উপকূলের কাছে আবারও একটি তেলবাহী ট্যাংকার জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে। ওমান উপকূল থেকে প্রায় ৬ নটিক্যাল মাইল পূর্বে একটি অজ্ঞাত বস্তু এসে জাহাজটিতে আঘাত হানে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউনাইটেড কিংডম মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। প্রাথমিক প্রতিবেদনে জানা গেছে, হামলায় ট্যাংকারটির ক্রুদের কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি এবং তারা সবাই নিরাপদ রয়েছেন। এছাড়া ঘটনার ফলে সাগরে কোনো তেল নিঃসরণ বা পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটেনি। সাময়িক বিঘ্ন ঘটলেও পরবর্তী সময়ে ট্যাংকারটি তার নির্ধারিত গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা হয়।
এই হামলার ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটল, যখন মধ্যপ্রাচ্যের এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটিতে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা নতুন করে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর মাত্র কয়েক দিন আগে ওমান উপকূলে মার্কিন সামরিক বাহিনীর ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় দুটি বাণিজ্যিক জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যেখানে তিন ভারতীয় নাবিক নিহত হন। ওই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই নতুন করে এই হামলার ঘটনা ঘটায় অঞ্চলটিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
নিজেদের তিন নাগরিক নিহতের ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে নয়াদিল্লি। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ইতিমধ্যে পরপর দুইবার মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে তলব করে আনুষ্ঠানিক অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। আন্তর্জাতিক আইন ও নৌনিরাপত্তা লঙ্ঘন করে এই হামলা চালানো হয়েছে বলে ভারতের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে।
তবে এই কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই মার্কিন পররাষ্ট্র নীতিতে কড়া অবস্থানের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সাথে এক ফোনালাপে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, হরমুজ প্রণালি ও ইরানি বন্দরগুলোর ওপর ওয়াশিংটন যে কঠোর অর্থনৈতিক ও সামরিক অবরোধ আরোপ করেছে, তা বিশ্বের সকল দেশকে মেনে চলতে হবে। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে সাফ জানানো হয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইরানের তেল বা অন্য কোনো পণ্য অবৈধভাবে পরিবহন করা হলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া অব্যাহত থাকবে।
বর্তমানে ইউরোপ সফরে থাকা ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে ফোনালাপে ওমান উপসাগরে মার্কিন সামরিক হামলায় তিন ভারতীয় নাবিক নিহতের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে উত্থাপন করেন। তিনি আন্তর্জাতিক জলসীমায় বেসামরিক নাবিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন। জবাবে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াশিংটনের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, “হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা অবরোধের লঙ্ঘন এবং ইরানের তেলের অবৈধ পরিবহন কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না।” মার্কিন প্রশাসন এই অঞ্চলে তাদের নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে যেকোনো ধরনের ছাড় দিতে নারাজ, তা এই বক্তব্য থেকে স্পষ্ট।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি পরিবহন পথ, যার মাধ্যমে বৈশ্বিক খনিজ তেলের একটি বড় অংশ পরিবাহিত হয়। এই অঞ্চলের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের জের ধরে এই নৌপথে প্রায়শই বাণিজ্যিক জাহাজগুলো লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন বাহিনীর সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ এবং এর ফলে ভারতের মতো মিত্র দেশের নাগরিকদের প্রাণহানি ওয়াশিংটন ও নয়াদিল্লির দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে নতুন কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে সৃষ্ট এই উত্তেজনা দ্রুত প্রশমিত না হলে তা বিশ্ব বাণিজ্য ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য দীর্ঘমেয়াদি সংকট তৈরি করতে পারে।


