আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সাম্প্রতিক সমঝোতা স্মারক বা শান্তিচুক্তি নিয়ে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের মধ্যে নজিরবিহীন কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের এই উদ্যোগের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি মন্ত্রিসভার কট্টরপন্থী সদস্যদের কঠোর সমালোচনার জবাবে তীব্র হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন মার্কিন ভাইস-প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স। ইসরায়েলকে বাস্তব পরিস্থিতি মেনে নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই তাদের একমাত্র নির্ভরযোগ্য বন্ধু এবং কেবল সামরিক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে সব জাতীয় নিরাপত্তা সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
হোয়াইট হাউসের এই শান্তি প্রচেষ্টার বিরোধিতা করায় ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর মন্ত্রিসভাকে ইঙ্গিত করে ভাইস-প্রেসিডেন্ট বলেন, তারা মূলত নিজেদের প্রধান মিত্রকেই অপমান করছে। এছাড়া লেবাননে বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করে চালানো সাম্প্রতিক বিমান হামলা শান্তি আলোচনাকে বাধাগ্রস্ত করছে বলেও তিনি সরাসরি অভিযোগ তোলেন। একটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ভ্যান্স উল্লেখ করেন, ৯০ লাখ জনসংখ্যার একটি দেশ কেবল যুদ্ধের ওপর নির্ভর করে টিকে থাকতে পারে না। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, বিগত তিন মাসে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষায় ব্যবহৃত অস্ত্রের দুই-তৃতীয়াংশই মার্কিন করদাতাদের অর্থে সরবরাহ করা হয়েছে।
এর বিপরীতে ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী মন্ত্রী ইতামার বেন-গ্যভির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছেন, বর্তমান ইরানের নেতৃত্বকে বিংশ শতাব্দীর নাজি বাহিনীর মতোই দমন করা উচিত। ইসরায়েলের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্ব এই চুক্তিকে একটি ‘বিপর্যয়’ ও ‘মারাত্মক আত্মসমর্পণ’ হিসেবে দেখছেন, যা দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও বড় ধরনের আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
ঐতিহাসিক এই সমঝোতা স্মারকের আওতায় ইরানের প্রায় ২০০ বিলিয়ন ডলারের অবরুদ্ধ তহবিল অবমুক্ত করা, ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি পুনর্গঠন পরিকল্পনা গ্রহণ এবং দেশটির তেল খাতের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের মতো বড় ধরনের অর্থনৈতিক ছাড় দেওয়া হয়েছে। বিনিময়ে ইরান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির ওপর থেকে তাদের সামরিক নিয়ন্ত্রণ শিথিল করতে সম্মত হয়েছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কমতে শুরু করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেলের মূল্য গত মার্চের পর প্রথমবারের মতো প্রতি গ্যালনে ৪ ডলারের নিচে নেমে এসেছে।
তবে এই চুক্তিতে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির ওপর তাৎক্ষণিক কোনো কঠোর নিষেধাজ্ঞা অন্তর্ভুক্ত না থাকায় খোদ ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টির ভেতরেই তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। দলটির শীর্ষস্থানীয় নীতি নির্ধারকদের একাংশ এটিকে তেহরানের কাছে মার্কিন প্রশাসনের ‘আত্মসমর্পণ’ বলে অভিহিত করেছেন।
এদিকে, গত মার্চে দায়িত্ব গ্রহণকারী ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি এক বিবৃতিতে দাবি করেছেন, ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার কারণেই ট্রাম্প প্রশাসন এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, ভবিষ্যৎ কোনো আলোচনায় ইরান শত্রুপক্ষের কোনো একতরফা শর্ত মেনে নেবে না।
বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘমেয়াদি ভূ-রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে। মার্কিন ভাইস-প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স এই পদক্ষেপের পক্ষে যুক্তি দিয়ে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও ভোটারদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছেন যে, এর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যয়বহুল যুদ্ধ এড়ানো সম্ভব হবে। তবে দীর্ঘদিনের মিত্র ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রকাশ্য মতবিরোধ আগামী দিনগুলোতে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে কী প্রভাব ফেলে, তা-ই এখন দেখার বিষয়।


