আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত সামরিক অভিযানের কৌশলগত ফলাফল এবং লক্ষ্য অর্জন নিয়ে ইসরায়েলের অভ্যন্তরে তীব্র অসন্তোষ ও জনমনে গভীর ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত একটি যৌথ জনমত জরিপে দেখা গেছে, দেশটির সিংহভাগ নাগরিকই এই যুদ্ধের ফলাফলকে ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার জন্য ক্ষতিকর এবং সামগ্রিকভাবে ব্যর্থ হিসেবে বিবেচনা করছেন। মার্কিন বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে শুরু করা এই অভিযানের মূল লক্ষ্যগুলো অর্জিত না হওয়ায় বর্তমানে তেল আবিবের নীতিনির্ধারকদের কৌশলগত অবস্থান ও নেতৃত্ব বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
জেরুজালেমের হিব্রু ইউনিভার্সিটি এবং ‘আগাম ইনস্টিটিউট’ কর্তৃক যৌথভাবে পরিচালিত এই জরিপে ইসরায়েলি জনগণের চরম হতাশার চিত্র ফুটে উঠেছে। জরিপের ফলাফল অনুযায়ী, ৯২ শতাংশ ইসরায়েলি নাগরিক মনে করেন এই দ্বিপাক্ষিক সংঘাতে ইরানই চূড়ান্তভাবে বিজয়ী পক্ষ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এছাড়া, ৮৩ শতাংশ উত্তরদাতা স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, এই সামরিক অভিযান ইসরায়েলের দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় নিরাপত্তাকে শক্তিশালী করার পরিবর্তে উল্টো দুর্বল করে দিয়েছে। সামগ্রিক ফলাফল নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন ৮৬ শতাংশ নাগরিক।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষভাগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ সহায়তায় ইরানের ওপর যৌথ সামরিক অভিযান শুরু করেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। অভিযানের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল তেহরানের পারমাণবিক অবকাঠামো এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সম্পূর্ণ ধ্বংস করা, যাতে দেশটির সরকারকে একটি চরম বিপর্যয়ের মুখে ফেলা যায়। তবে বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে। সামরিক উপায়ে লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়ে বর্তমানে সুইজারল্যান্ডে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক সমঝোতা ও শান্তি আলোচনা চলছে। ওয়াশিংটন ও তেহরানের এই আলোচনার সূত্রপাত ইসরায়েলের অভ্যন্তরে চলমান যুদ্ধ ও সামরিক ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে বিতর্ক আরও উসকে দিয়েছে।
জরিপটি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং যুদ্ধকালীন নেতৃত্বের ওপর বড় ধাক্কা দিয়েছে। নেতানিয়াহু পূর্বে দাবি করেছিলেন যে, ইসরায়েল এই যুদ্ধে অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে এবং দেশের অস্তিত্বগত সংকট দূর করতে সক্ষম হয়েছে। তবে ৭২ দশমিক ৫ শতাংশ ইসরায়েলি নাগরিক প্রধানমন্ত্রীর এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। এছাড়া, প্রায় ৮৮ শতাংশ উত্তরদাতার মতে, ইসরায়েল তার পূর্বঘোষিত সামরিক লক্ষ্যগুলো অর্জনে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে অথবা সর্বোচ্চ আংশিক সাফল্য পেয়েছে। যুদ্ধ পরিচালনায় নেতানিয়াহুর ব্যক্তিগত ভূমিকা ‘দুর্বল’ ছিল বলে মনে করেন ৫৬ শতাংশ মানুষ।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ এই জনমত দেশটির রাজনৈতিক ও সামরিক নীতিনির্ধারকদের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ। এই যুদ্ধের আপাত পরিণতি মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব এবং আঞ্চলিক প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করতে পারে বলে তারা মনে করছেন।
অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ থাকলেও দক্ষিণ লেবাননে চলমান সামরিক অভিযান এবং সেনা মোতায়েনের বিষয়ে ইসরায়েলিদের মধ্যে ভিন্ন সমীকরণ দেখা গেছে। জরিপ অনুযায়ী, ৪৮ শতাংশ নাগরিক লেবাননে ইরান-সমর্থিত রাজনৈতিক ও সামরিক সংগঠন হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করে পরিচালিত অভিযান অব্যাহত রাখার পক্ষে মত দিয়েছেন। এমনকি এই অভিযানের কারণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি হলেও সামরিক চাপ বজায় রাখার পক্ষে অবস্থান অনেকের।
এদিকে, লেবানন ইস্যুটি বর্তমানে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার শান্তি আলোচনার প্রধান প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইরানের পক্ষ থেকে সাফ জানানো হয়েছে, ইসরায়েল যতদিন লেবাননের অভ্যন্তরে হামলা ও সেনা মোতায়েন বজায় রাখবে, ততদিন মধ্যপ্রাচ্যে কোনো স্থায়ী যুদ্ধবিরতি চুক্তি সম্ভব নয়।
গত ১৭ থেকে ২০ জুন পর্যন্ত হিব্রু ইউনিভার্সিটির সহযোগিতায় এই জরিপটি পরিচালিত হয়। এতে ১৭ বছর বা তার বেশি বয়সী ৩ হাজার ৬৪৪ জন ইসরায়েলি নাগরিক অংশ নেন। ৯৯ শতাংশ আত্মবিশ্বাসের স্তরে (confidence level) পরিচালিত এই জরিপের সম্ভাব্য ত্রুটির মাত্রা (margin of error) ছিল মাত্র ২ দশমিক ২ শতাংশ, যা এই জনমতের উচ্চ গ্রহণযোগ্যতা নির্দেশ করে।


