জাতীয় ডেস্ক
বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক অর্জিত হলো। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মাণাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে আজ মঙ্গলবার থেকে শুরু হয়েছে পারমাণবিক জ্বালানি (ইউরেনিয়াম) লোডিং কার্যক্রম। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশটি আনুষ্ঠানিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের চূড়ান্ত ধাপে প্রবেশ করল, যা জাতীয় গ্রিডে স্থিতিশীল বিদ্যুৎ সরবরাহে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে।
মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) দুপুর ৩টায় প্রকল্প এলাকায় আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই জ্বালানি লোডিং কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রসি, রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি করপোরেশন ‘রোসাটমের’ মহাপরিচালক এলেক্সি লিখাচভ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব আনোয়ার হোসেনসহ দেশি-বিদেশি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাবৃন্দ।
রূপপুর প্রকল্পের এই অগ্রগতি স্থানীয় জনমনে ব্যাপক উৎসাহ ও উদ্দীপনার সৃষ্টি করেছে। ঈশ্বরদীর বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা একে দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির চাবিকাঠি হিসেবে দেখছেন। স্থানীয় কৃষি ও ব্যবসার প্রসারে এই প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। জাতীয় পদকপ্রাপ্ত কৃষক সিদ্দিকুর রহমান বলেন, এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালু হওয়া ঈশ্বরদীবাসীর জন্য গর্বের বিষয়। এটি কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদনই নয়, আধুনিক সেচ ব্যবস্থা ও কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পেও ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে।
রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যক্তিত্বরাও এই অর্জনকে জাতীয় উন্নয়নের অপরিহার্য অংশ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। পাবনা জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হাবিবুর রহমান হাবিব এই উদ্যোগকে সময়োপযোগী বলে উল্লেখ করেন। তিনি জানান, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের এই সময়ে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদন শুরু হওয়া দেশের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। সরকারি দিকনির্দেশনায় গৃহীত এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের বিদ্যুতের দীর্ঘদিনের ঘাটতি পূরণ হবে।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে রূপপুর প্রকল্প ঈশ্বরদীসহ উত্তরবঙ্গের বাণিজ্যিক মানচিত্র বদলে দেবে বলে মনে করছেন স্থানীয় উদ্যোক্তারা। ব্যবসায়ী ও পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, বিশাল এই কর্মযজ্ঞের ফলে এলাকায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে এবং আবাসন ও পরিবহন খাতে বিনিয়োগ বাড়ছে। ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পায়নের যে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হচ্ছে, তার সুফল ভোগ করবে পুরো বাংলাদেশ। বিশেষ করে তরুণেরা এই প্রকল্পকে উন্নত প্রযুক্তিগত শিক্ষার হাতেখড়ি এবং বৈশ্বিক মানের ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ হিসেবে দেখছেন।
প্রকল্পের কারিগরি বিবর্তনের দিকে তাকালে দেখা যায়, পাবনার ঈশ্বরদীর পদ্মা নদীর তীরে অবস্থিত এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের মূল নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছিল ২০১৭ সালের ৩০ নভেম্বর। দীর্ঘ প্রক্রিয়ার পর চলতি মাসের ১৬ তারিখে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বিএইআরএ) প্রথম ইউনিটের জন্য প্রয়োজনীয় ‘কমিশনিং লাইসেন্স’ প্রদান করে। এই লাইসেন্স প্রাপ্তির পরই নিয়ম অনুযায়ী জ্বালানি লোডিং বা চুল্লিতে ইউরেনিয়াম স্থাপনের পথ সুগম হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পারমাণবিক জ্বালানি লোডিং একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও জটিল প্রক্রিয়া, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও নিরাপত্তা বিধি কঠোরভাবে মেনে সম্পন্ন করতে হয়। এই ধাপটি সফলভাবে শেষ হওয়ার পর শুরু হবে বিভিন্ন পর্যায়ের কারিগরি পরীক্ষা-নিরীক্ষা। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে, প্রথম ইউনিট থেকে প্রাথমিকভাবে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা সম্ভব হবে। পরবর্তীতে ধাপে ধাপে এর উৎপাদন ক্ষমতা ১২০০ মেগাওয়াটে উন্নীত করা হবে।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কেবল একটি বিদ্যুৎ প্রকল্প নয়, এটি বাংলাদেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উৎকর্ষের এক জীবন্ত দলিল। এটি বাস্তবায়িত হলে দেশ কেবল লোডশেডিংমুক্ত হবে না, বরং শিল্পায়নের প্রয়োজনীয় সস্তা ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি নিশ্চিত হবে। বর্তমান জ্বালানি পরিস্থিতিতে রূপপুর প্রকল্পের এই অগ্রগতিকে দেশের অর্থনীতির জন্য একটি শক্তিশালী রক্ষাকবচ হিসেবে বিবেচনা করছেন বিশেষজ্ঞরা।


