বিশ্বশান্তি রক্ষায় বাংলাদেশের দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত, মরক্কোয় আন্তর্জাতিক সম্মেলনে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী

বিশ্বশান্তি রক্ষায় বাংলাদেশের দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত, মরক্কোয় আন্তর্জাতিক সম্মেলনে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী

জাতীয়  ডেস্ক

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের দৃঢ় ও অবিচল অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। মরক্কোর রাজধানী রাবাতে অনুষ্ঠিত ফ্রাঙ্কোফোন পরিবেশে শান্তিরক্ষা বিষয়ক দ্বিতীয় মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলনে এই অবস্থানের কথা তুলে ধরা হয়। সম্মেলনে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, মরক্কো ও ফ্রান্স সরকারের যৌথ আয়োজনে গত ২০ মে (বৃহস্পতিবার) এই উচ্চপর্যায়ের সম্মেলনটি অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অবদানের কথা স্মরণ করার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একগুচ্ছ প্রস্তাবনা উপস্থাপন করা হয়।

সম্মেলনে প্রদত্ত বক্তব্যে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমকে কেবল একটি আন্তর্জাতিক দায়িত্ব হিসেবে দেখে না, বরং একে মানবতার প্রতি গভীর নৈতিক দায়বদ্ধতা হিসেবে বিবেচনা করে। বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক নীতির প্রতি অটল থেকে বাংলাদেশ বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করছে। তিনি উল্লেখ করেন, বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে দেশের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমকে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে আরও গভীরভাবে বেগবান করা হয়েছে।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট স্মরণ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দূরদর্শী পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের এই গৌরবময় যাত্রার সূচনা হয়েছিল। পরবর্তীতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার শাসন আমলে এই নীতি আরও শক্তিশালী ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি লাভ করে। তিনি আরও যোগ করেন, বর্তমানে অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে সামাজিক সুরক্ষা, শিক্ষা সংস্কার ও নারীর ক্ষমতায়নের যেসব চলমান উদ্যোগ রয়েছে, তা মূলত টেকসই বৈশ্বিক শান্তির ভিত্তি গড়ে তুলছে।

বাংলাদেশ বর্তমানে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে শীর্ষ তথ্য ও সেনা প্রেরণকারী দেশগুলোর অন্যতম। বিশ্বশান্তির পুণ্যভূমিতে দায়িত্ব পালনকালে এ পর্যন্ত দেশের ১৭৪ জন বীর সদস্য আত্মোৎসর্গ করেছেন। সম্মেলনে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী গভীর শ্রদ্ধার সাথে এই শহিদ শান্তিরক্ষীদের অবদান স্মরণ করেন এবং তাদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান। একই সাথে তিনি আধুনিক শান্তিরক্ষা মিশনে নারী শান্তিরক্ষীদের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণকে বাংলাদেশের একটি অন্যতম প্রধান ও যুগান্তকারী অর্জন হিসেবে উল্লেখ করেন।

বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের বহুমুখী চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করে শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, আধুনিক যুদ্ধবিগ্রহ ও সংঘাতের ধরন বদলেছে। এখন শান্তিরক্ষীদের কেবল সম্মুখ যুদ্ধ নয়, বরং ভুল তথ্য, ডিজিটাল হয়রানি এবং সাইবার প্রযুক্তির অপব্যবহারের মতো নানাবিধ আধুনিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় তিনি প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহারের ওপর জোর দেন।

নিরাপত্তা ও কাঠামোগত সংস্কারের ওপর গুরুত্বারোপ করে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের প্রধান বলেন, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনগুলোকে আরও কার্যকর এবং গতিশীল করতে হলে কিছু মৌলিক বিষয়ে পরিবর্তন জরুরি। এর মধ্যে রয়েছে স্পষ্ট ও বাস্তবসম্মত ম্যান্ডেট নির্ধারণ, পর্যাপ্ত ও সময়োপযোগী অর্থায়ন নিশ্চিতকরণ, এবং সেনা ও পুলিশ প্রেরণকারী দেশগুলোর (টিসিসি/পিসিসি) মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয় বৃদ্ধি করা। বিশেষ করে প্রতিকূল পরিবেশে নিয়োজিত শান্তিরক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানানো হয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শান্তিরক্ষীদের গুণগত মানোন্নয়নে বাংলাদেশের বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান ‘বাংলাদেশ শান্তি সমর্থন কার্যক্রম প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট’ (বিপসট)-এর ভূমিকা তুলে ধরেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বিশ্বমানের প্রাক-মোতায়েন প্রশিক্ষণ আরও জোরদার করার তাগিদ দেন। একই সাথে বর্তমান জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মাথায় রেখে পরিবেশবান্ধব শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের পরিবেশগত প্রতিশ্রুতির কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। উল্লেখ্য, এর আগে ২০১৬ সালে প্রথমবারের মতো এই ফ্রাঙ্কোফোন শান্তিরক্ষা বিষয়ক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

এদিকে, সম্মেলনের পাশাপাশি একই দিন সন্ধ্যায় রাবাতের ফোর সিজনস হোটেলে অনুষ্ঠিত ‘গ্লোবাল গ্রোথ কনফারেন্স ২০২৬’-এর একটি বিশেষ অধিবেশনে মূল বক্তা হিসেবে অংশ নেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। সেখানে তিনি বর্তমান বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন, শক্তির ভারসাম্য এবং আন্তর্জাতিক মেরুকরণের ফলে সৃষ্ট বিভাজনের প্রভাব নিয়ে বাংলাদেশের নিরপেক্ষ ও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান বিশ্বনেতাদের সামনে তুলে ধরেন। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতার জন্য আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধির ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।

জাতীয় শীর্ষ সংবাদ