জাতীয় ডেস্ক
সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় শুরু হওয়া ৭৯তম ওয়ার্ল্ড হেলথ অ্যাসেম্বলিতে (বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলন) দেশের স্বাস্থ্য খাতের সংস্কার, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং রোহিঙ্গা সংকটের কারণে সৃষ্ট চ্যালেঞ্জগুলো বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরেছে বাংলাদেশ। সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত দেশের সার্বিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি এবং টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানান।
প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন, বর্তমান সরকার জাতীয় উন্নয়নের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে স্বাস্থ্য খাতকে স্থান দিয়েছে। তবে দেশের বিদ্যমান স্বাস্থ্য অর্থায়নের চিত্রটি তুলে ধরে তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৭০ শতাংশের বেশি অর্থ রোগীকে নিজের পকেট থেকে খরচ করতে হয়। এই বিপুল পরিমাণ চিকিৎসা ব্যয় নির্বাহ করতে গিয়ে দেশের বহু পরিবার প্রতিবছর দারিদ্র্যের মুখোমুখি হচ্ছে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করছে। এই পরিস্থিতির উত্তরণে সরকার ধাপে ধাপে সরকারি স্বাস্থ্য বরাদ্দ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। একই সাথে সবার জন্য সমন্বিত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ, তৃণমূল থেকে উচ্চতর পর্যায় পর্যন্ত একটি কার্যকর রেফারাল সিস্টেম চালু এবং যুগোপযোগী ডিজিটালাইজেশনের ওপর গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের কাঠামোগত সংস্কারের বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী জানান, সরকার সবার জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি খাতের স্বাস্থ্য তথ্যের মধ্যে সমন্বয় সাধনের কাজ শুরু করেছে। এ ছাড়া সংক্রামক রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং মানসিক স্বাস্থ্য, প্রতিবন্ধীবান্ধব সেবা ও অসংক্রামক রোগ মোকাবিলায় সরকারি কার্যক্রম আরও জোরদার করা হচ্ছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন পদ্ধতি প্রবর্তনের লক্ষ্যে দেশজুড়ে বিভিন্ন জনমুখী কর্মসূচি গ্রহণ করা হচ্ছে।
সম্মেলনে বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট স্বাস্থ্যগত বিপর্যয় এবং এর বিপরীতে বাংলাদেশের ঝুঁকির বিষয়টি গুরুত্বের সাথে উত্থাপন করা হয়। ড. এম এ মুহিত বলেন, বাংলাদেশ জলবায়ু ঝুঁকির সামনের সারিতে রয়েছে এবং এর ফলে দেশের জনস্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে রোগের ধরন ও প্রকোপ দ্রুত পাল্টাচ্ছে, যা দেশের বিদ্যমান সীমিত চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর মারাত্মক অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে।
জলবায়ু সংকটের পাশাপাশি ভূ-রাজনৈতিক কারণে সৃষ্ট রোহিঙ্গা সমস্যাও বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের ওপর বিশাল বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে সম্মেলনে জানানো হয়। মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হওয়া ১.৩ মিলিয়নেরও বেশি রোহিঙ্গা নাগরিকের দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি বাংলাদেশের সীমিত স্বাস্থ্য অবকাঠামো ও সম্পদের ওপর চরম চাপ সৃষ্টি করেছে। মানবিক কারণে বাংলাদেশ এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় ও স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসলেও, দীর্ঘ মেয়াদে এটি দেশের নিজস্ব জনগণের স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তিকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে।
বর্তমান বিশ্বপরিস্থিতিতে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বৈশ্বিক স্বাস্থ্য অর্থায়নের সংকোচন, আঞ্চলিক সংঘাত ও মানবিক সংকটের কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বাস্থ্য খাত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ও দক্ষ ব্যবহারের তাগিদ দেন তিনি।
বিশেষ করে বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান অসংক্রামক রোগের বিস্তার এবং অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা হারানো) বা এএমআর-এর মতো নীরব ঘাতক মোকাবিলায় বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব ও সহযোগিতা আরও শক্তিশালী করার ওপর জোর দেন বাংলাদেশের স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী। তিনি স্পষ্ট করেন যে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর একাংশের প্রচেষ্টায় এই বৈশ্বিক মহামারি ও স্বাস্থ্যঝুঁকি রোধ করা সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন উন্নত ও অনুন্নত দেশগুলোর সম্মিলিত অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা।


