আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা চরম সংকটের মুখে পড়েছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান উত্তেজনার পারদ গত আট দিনে নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। ধারাবাহিক সামরিক উত্তেজনার এক পর্যায়ে ইরানের একটি পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রে মার্কিন বাহিনীর বিমান হামলার ঘটনা ঘটেছে। এই সংঘাতের প্রেক্ষিতে দুই দেশের স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছে তেহরান। এ ঘটনা পুরো অঞ্চলকে এক অনিশ্চিত পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিয়েছে।
চলতি মাসের ১৭ জুন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল। কিন্তু উভয় পক্ষই এই চুক্তির শর্তাবলী বাস্তবায়নে ব্যর্থ হওয়ায় পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটে। চুক্তির অন্যতম শর্ত ছিল হরমুজ প্রণালি দিয়ে ইরান নিয়ন্ত্রিত জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। তবে যুক্তরাষ্ট্র এই রুটের পরিবর্তে জর্ডান উপকূল দিয়ে জাহাজ চলাচলের দাবি জানালে বিরোধের সূত্রপাত হয়। এর ধারাবাহিকতায় ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপের চেষ্টা করলে মার্কিন বাহিনীর সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষের পরিবেশ তৈরি হয়।
গত শনিবার রাতে ইরান সীমান্তের দারখোভিন অঞ্চলে নির্মাণাধীন একটি পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রে মার্কিন সামরিক বাহিনী ভয়াবহ হামলা চালায়। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ) হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছে যে, তারা এই ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে। ইরান এই ঘটনাকে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ হিসেবে অভিহিত করে আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন বলে দাবি করেছে। ইরানের আণবিক শক্তি সংস্থার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বেসামরিক পরমাণু অবকাঠামোর ওপর এই আক্রমণ বৈশ্বিক নিরাপত্তা কাঠামোর জন্য বড় ধরনের হুমকি।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের ভাষ্যমতে, এই সামরিক অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কৌশলগত সক্ষমতা হ্রাস করা এবং জর্ডানে মার্কিন সেনা সদস্যদের ওপর হামলার জবাব দেওয়া। শনিবার রাতের অভিযানে পরমাণু কেন্দ্রের পাশাপাশি সিরিক শহর এবং ইরাক সীমান্তবর্তী শাদেগান শহরের বিভিন্ন স্থাপনাকেও লক্ষ্যবস্তু করা হয়।
পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে তেহরান কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি আল-আদিরি ক্যাম্প এবং আলী আল সালেম বিমানঘাঁটিতে হামলার দাবি করেছে। কুয়েত কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রবিবার দেশটির একটি পানি পরিশোধনাগারেও হামলা হয়েছে। এছাড়া, জর্ডান সীমান্ত এলাকায় ইরানের ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে স্থানীয় সামরিক বাহিনী। যদিও ড্রোন ধ্বংসের বিষয়ে ইরানের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতা নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে বাধা দেওয়াই তাদের মূল লক্ষ্য। অন্যদিকে, ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘরিবাবাদি সমঝোতা স্মারক স্থগিতের ঘোষণা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকাণ্ডের ‘বিপর্যয়কর জবাব’ দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এবং পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে এই সংঘাত কেবল দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক ইস্যুতেই সীমাবদ্ধ নেই। এই অস্থিরতা আঞ্চলিক জ্বালানি সরবরাহ ও নিরাপত্তার ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। পরমাণু স্থাপনায় হামলার ঘটনা এই উত্তেজনার তীব্রতা বাড়িয়ে দিয়েছে, যা ভবিষ্যতে বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের দিকে ধাবিত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখন পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে এবং কূটনৈতিক সমাধানের পথ খোঁজার আহ্বান জানাচ্ছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো পক্ষই নমনীয় হওয়ার লক্ষণ দেখাচ্ছে না।


