আইন-শৃঙ্খলা ডেস্ক
বিতর্কিত চার কর্মকর্তার নাম বাদ দিয়ে বাংলাদেশ পুলিশ পদকের (বিপিএম ও পিপিএম) চূড়ান্ত তালিকা প্রস্তুত করেছে পুলিশ সদর দপ্তর। সংশোধিত এই তালিকায় মোট ১০৫ জন পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্যের নাম স্থান পেয়েছে। চূড়ান্ত তালিকাটি সরকারি আদেশ (জিও) জারির জন্য প্রায় দুই সপ্তাহ আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে জিও জারি হলেই আনুষ্ঠানিকভাবে এই পদক প্রদান করা হবে।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, ঐতিহ্যগতভাবে পদক বিতরণের অনুষ্ঠানটি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে সম্পন্ন হয়ে থাকে। সেই ধারাবাহিকতায় এবারও প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতি নিশ্চিত করে অনুষ্ঠান আয়োজনের সার্বিক প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। সময়সূচি সংক্রান্ত বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি পাওয়ার পরেই অনুষ্ঠানের সুনির্দিষ্ট তারিখ নির্ধারণ ও ঘোষণা করা হবে।
এর আগে প্রস্তুতকৃত পদকপ্রাপ্তদের খসড়া তালিকায় ১০৯ জনের নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে তালিকাটি প্রকাশের পর কতিপয় কর্মকর্তার নাম নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে পদক প্রদান কমিটি বিষয়টি পুনর্নিরীক্ষা করে এবং চূড়ান্ত ধাপে বিতর্কিত চার কর্মকর্তাকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। পদক প্রদান কমিটির সভাপতি এবং পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি খন্দকার রফিকুল ইসলাম নিশ্চিত করেছেন যে, প্রাথমিক তালিকায় ১০৯ জন থাকলেও সার্বিক বিবেচনা শেষে ১০৫ জনের নাম চূড়ান্ত করা হয়েছে।
তালিকা থেকে বাদ পড়া চার কর্মকর্তা হলেন— ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার সরওয়ার হোসেন, ডিএমপির গোয়েন্দা (ডিবি) প্রধান শফিকুল ইসলাম, পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (পার্সোনেল ম্যানেজমেন্ট-১) মো. আসাদুজ্জামান এবং ডিএমপির বোম ডিসপোজাল টিমের এসআই গোলাম মুর্তজা। অনুসন্ধান ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বাদ পড়া কর্মকর্তাদের মধ্যে এসআই গোলাম মুর্তজা ব্যতীত অন্য তিনজন বিগত সরকারের আমলেও রাষ্ট্রীয় পুলিশ পদকে ভূষিত হয়েছিলেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তাদের পুনরায় পদকের জন্য মনোনীত করা নিয়ে পেশাগত ও জনপরিসরে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়। নিরপেক্ষতা বজায় রাখা এবং পদকের ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ন রাখার স্বার্থেই তাদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রতিবছর বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর কর্মকর্তা ও সদস্যদের বীরত্বপূর্ণ সাহসিকতা, অসামান্য পেশাগত দক্ষতা, শৃঙ্খলা রক্ষা এবং জনসেবায় অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ চারটি প্রধান ক্যাটাগরিতে এই রাষ্ট্রীয় পদক প্রদান করা হয়। ক্যাটাগরিগুলো হলো— বাংলাদেশ পুলিশ পদক (বিপিএম), রাষ্ট্রপতি পুলিশ পদক (পিপিএম), বাংলাদেশ পুলিশ পদক-সেবা (বিপিএম-সেবা) এবং রাষ্ট্রপতি পুলিশ পদক-সেবা (পিপিএম-সেবা)। এটি পুলিশ সদস্যদের জন্য পেশাগত জীবনের সর্বোচ্চ সম্মাননা হিসেবে বিবেচিত।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই পদক প্রদান ও কর্মকর্তা নির্বাচনের মানদণ্ড নিয়ে নানা মহলে প্রশ্ন ও সমালোচনা তৈরি হয়েছিল। দলীয়করণ ও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠায় পদকের বস্তুনিষ্ঠতা নিয়ে যে অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছিল, চলতি বছরও তার পুনরাবৃত্তি ঘটে।
চলতি বছর রাজাবাগ পুলিশ লাইনস মাঠে চার দিনব্যাপী বার্ষিক পুলিশ সপ্তাহ-২০২৬ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। পূর্ব নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী উদ্বোধনের দিনই আনুষ্ঠানিকভাবে এই চার ক্যাটাগরির পদক তুলে দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মনোনীতদের তালিকা নিয়ে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হওয়ায় এবং পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেওয়ায় উদ্বোধনের ঠিক আগের রাতে পদক প্রদান অনুষ্ঠানটি স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেয় কর্তৃপক্ষ।
পরবর্তীতে বিতর্কিতদের বাদ দিয়ে তালিকা পরিমার্জন করায় পদক নির্বাচনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও বস্তুনিষ্ঠতা ফিরিয়ে আনার একটি প্রয়াস লক্ষ্য করা যাচ্ছে। নতুন এই সিদ্ধান্তের ফলে পুলিশের নিয়মিত শৃঙ্খলা, পেশাদারিত্ব এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন নিশ্চিত করার বার্তা দেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জিও জারি হওয়ার পর শিগগিরই একটি জমকালো অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মনোনীতদের হাতে এই পদক তুলে দেওয়া হবে।


