আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে জেনেরিক ওষুধের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে আমদানিকৃত জেনেরিক ওষুধের ওপর নজিরবিহীন হারে শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৮ সাল থেকে আমদানিকৃত জেনেরিক ওষুধে ১০০ শতাংশ শুল্ক বসানো হবে, যা পরবর্তী বছর অর্থাৎ ২০২৯ সালে বাড়িয়ে ২০০ শতাংশে উন্নীত করা হবে। সম্প্রতি নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক বার্তায় এই কঠোর সিদ্ধান্তের কথা নিশ্চিত করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী ১ আগস্ট থেকে পরবর্তী দুই বছরের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে আমদানিকৃত সব ধরনের জেনেরিক ওষুধের ওপর শূন্য শতাংশ শুল্ক বহাল থাকবে। এই দুই বছরের ক্রান্তিকাল বা ছাড়ের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর কঠোর শুল্ক নীতি কার্যকর শুরু হবে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যেসব ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান যুক্তরাষ্ট্রে নিজস্ব কারখানা ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম স্থাপন করে উৎপাদন শুরু করতে ব্যর্থ হবে, মূলত তাদের ওপর শাস্তি বা জরিমানা হিসেবেই এই শুল্ক আরোপ করা হচ্ছে বলে হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে নির্দেশ করা হয়েছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিশ্বব্যাপী আলোচিত ‘মোস্ট-ফেভারড-নেশন’ ওষুধ মূল্যনীতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। নীতিটির মূল উদ্দেশ্য হলো বিশ্বের অন্যান্য উচ্চ আয়ের দেশে যে সুলভ মূল্যে ওষুধ বিক্রি হয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ নাগরিকরাও যেন ঠিক একই বা তার চেয়ে কম খরচে ওষুধ পেতে পারেন। তবে জেনেরিক ওষুধের ওপর ব্যাপক কড়াকড়ি আরোপ করা হলেও পেটেন্ট করা, ব্র্যান্ডেড কিংবা নতুন উদ্ভাবনী ওষুধের ক্ষেত্রে বর্তমানে বহাল থাকা নীতি অপরিবর্তিত থাকবে বলে জানানো হয়েছে।
মার্কিন খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের (এফডিএ) পরিসংখ্যান নির্দেশ করে যে, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বিক্রি হওয়া ও প্রেসক্রিপশনে উল্লেখিত মোট ওষুধের ৯০ শতাংশেরও বেশি জেনেরিক বা পেটেন্টহীন সাশ্রয়ী ওষুধ। ফলে মার্কিন প্রশাসনের এই আকস্মিক সিদ্ধান্ত বিশ্ব স্বাস্থ্য খাত, বৈশ্বিক ওষুধ সরবরাহ শৃঙ্খল এবং বিভিন্ন ওষুধ রফতানিকারক দেশের অর্থনীতির ওপর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষকরা।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ওষুধ প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলো, বিশেষ করে এশীয় ও ইউরোপীয় অঞ্চলের সাশ্রয়ী জেনেরিক ওষুধ সরবরাহকারীরা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারমুখী চালানের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। ভারতে উৎপাদিত জেনেরিক ওষুধ যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্য খাতের বড় অংশের চাহিদা মেটায়। এ ধরনের নজিরবিহীন শুল্কের কারণে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রে বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগের মাধ্যমে প্ল্যান্ট স্থাপন করতে হবে, অন্যথায় চড়া শুল্কের বোঝা বইতে হবে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, স্থানীয়ভাবে উৎপাদন খরচ অত্যন্ত বেশি হওয়ায় জেনেরিক ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন খরচ ব্যাপক বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ওষুধ সাশ্রয়ী করার যে প্রাথমিক লক্ষ্য রয়েছে, তা ব্যাহত হয়ে উল্টো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ রোগীদের জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধের দাম লাগামহীনভাবে বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এর আগে এপ্রিল মাসে জারি করা এক বিশেষ নির্বাহী আদেশে ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, আমদানিকৃত ব্র্যান্ডেড ওষুধ প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলো যদি মার্কিন সরকারের নির্ধারিত মূল্যে ওষুধ বিক্রি করতে রাজি না হয় কিংবা যুক্তরাষ্ট্রে কারখানা স্থাপন না করে, তবে তাদের ওপরও ১০০ শতাংশ শুল্ক চাপানো হবে। চলমান নীতি এবং সাম্প্রতিক কঠোরতম অবস্থানের কারণে সামগ্রিক ওষুধ উৎপাদন ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য খাতে এক নতুন অস্থিরতা সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।


