অপরাধ ডেস্ক
নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগে করা একটি মামলায় আদালতে হাজিরা দিয়েছেন। তিনি মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) বেলা ১১টায় নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নুরুল হুদা চৌধুরীর আদালতে উপস্থিত হয়ে হাজিরা প্রদান করেন। শুনানি শেষে আদালত মামলাটির চার্জশিট (অভিযোগপত্র) গ্রহণ করেন এবং আইভীর শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে পরবর্তীতে মামলার বিচারকাজ শুরু হওয়া পর্যন্ত তাকে সশরীরে উপস্থিতি থেকে অব্যাহতি দিয়েছেন।
আদালতের কার্যক্রম শেষে বের হওয়ার সময় সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী সাংবাদিকদের কাছে ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, “নির্দোষ হয়েও আমি অপরাধী। আমি সবসময় নারায়ণগঞ্জে প্রতিবাদ করেছি সর্বক্ষণ। হত্যা, অত্যাচার, জুলুমের বিরুদ্ধে আমি প্রতিবাদ করেছি, আর আজকে আমিই কি অপরাধী!” তিনি আরও মন্তব্য করেন, এই পরিস্থিতির বিচার সৃষ্টিকর্তা এবং নারায়ণগঞ্জের জনগণ করবেন। সংক্ষিপ্ত বক্তব্যের পর তিনি দেওভোগে অবস্থিত তার নিজ বাসভবনের উদ্দেশ্যে আদালত প্রাঙ্গণ ত্যাগ করেন।
আইনজীবী সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ৯ মে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চলাকালীন সংঘটিত একটি হত্যা মামলায় দেওভোগের নিজ বাসভবন ‘চুনকা কুটির’ থেকে সেলিনা হায়াৎ আইভীকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাকে গ্রেপ্তারের পর জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়ার পথে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গাড়িবহরে হামলা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগ ওঠে। ওই ঘটনায় নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানা পুলিশ বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করে। পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধে পর্যায়ক্রমে ১২টি হত্যা ও হত্যাচেষ্টার মামলা দায়ের করা হয়। দীর্ঘ ৩৯১ দিন গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগারে বন্দি থাকার পর চলতি বছরের ৪ জুন তিনি জামিনে মুক্তি পান।
আদালত সূত্র জানায়, মঙ্গলবার সংশ্লিষ্ট মামলার চার্জশিট গ্রহণের দিন ধার্য ছিল। আইভী বর্তমানে জামিনে থাকলেও আদালতের নির্ধারিত নিয়ম ও বিচারিক কার্যবিধি মেনে তিনি সশরীরে উপস্থিত হন। শুনানি চলাকালে তার আইনজীবী অ্যাডভোকেট আওলাদ হোসেন আদালতে আবেদন জানান যে, তার মক্কেল দীর্ঘ বন্দিদশার কারণে নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন এবং অত্যন্ত অসুস্থ। আবেদনের গুরুত্ব ও আইভীর শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে বিচারক তাকে নিয়মিত হাজিরা প্রদান থেকে অব্যাহতি মঞ্জুর করেন। এর ফলে মামলার আনুষ্ঠানিক বিচারকাজ বা সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু না হওয়া পর্যন্ত তাকে আর নিয়মিত আদালতে আসতে হবে না।
আইভীর আগমনকে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই নারায়ণগঞ্জ আদালত প্রাঙ্গণে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছিল। যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি ও বিশৃঙ্খলা এড়াতে অতিরিক্ত পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়। একই সঙ্গে সকাল থেকে আদালত চত্বরে তার সমর্থক ও স্থানীয় দলীয় নেতা-কর্মীদের উপস্থিতি দেখা যায়। তবে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কঠোর নজরদারির কারণে আদালত এলাকার সামগ্রিক পরিস্থিতি শান্ত ও স্বাভাবিক ছিল।
নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের টানা তিনবারের নির্বাচিত মেয়র হিসেবে সেলিনা হায়াৎ আইভী দীর্ঘ সময় ধরে স্থানীয় রাজনীতিতে একটি প্রভাবশালী নাম। ২০০৩ সালে প্রথম মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তিনি নারায়ণগঞ্জের সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে গিয়েছেন। সম্প্রতি তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত একাধিক অভিযোগ ও দীর্ঘ কারাবাস নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। আইভীর আইনজীবীরা জানিয়েছেন, তারা সকল আইনি প্রক্রিয়া ও প্রমাণের ভিত্তিতে আদালত থেকে তার পূর্ণাঙ্গ খালাস পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী।


