অর্থ-বাণিজ্য ডেস্ক
দেশে ব্যবসায়িক নিবন্ধন ও সার্বিক বিনিয়োগ সংক্রান্ত অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করার লক্ষ্যে এক ছাতার নিচে বিদ্যমান সকল ওয়ান স্টপ সার্ভিস (ওএসএস) পোর্টালকে নিয়ে আসার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ উদ্দেশ্যে ‘বাংলাবিজ’ নামের একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরির কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। ৬৬১ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ে নেওয়া এই বিশেষ প্রকল্পটি বর্তমানে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
মঙ্গলবার এক সরকারি সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই প্রকল্পের বিশদ বিবরণ প্রকাশ করা হয়। সরকারের এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো—বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা), বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা), বাংলাদেশ রফতানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষ (বেপজা), বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন (বিসিক) এবং বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের ওএসএস সেবাসমূহকে একত্রিত করে একক ডিজিটাল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা। এর মাধ্যমে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য সমস্ত সেবা এক জায়গায় প্রাপ্তির সুযোগ তৈরি হবে।
বাংলাদেশে ব্যবসা শুরু কিংবা বাণিজ্য সংক্রান্ত প্রাথমিক লাইসেন্স ও অন্যান্য নিয়ন্ত্রণমূলক অনুমতি পেতে এতদিন বিনিয়োগকারীদের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দীর্ঘসূত্রতার কারণে দুই থেকে তিন বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতো। এই দীর্ঘ সময়ক্ষেপণ দেশে বিনিয়োগ আকর্ষণে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে আসছিল। তবে ‘বাংলাবিজ’ প্ল্যাটফর্মটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে প্রাথমিক নিবন্ধন ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র মাত্র তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রদান করা সম্ভব হবে বলে সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞপ্তিতে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে।
প্রযুক্তিগত দিক থেকে প্ল্যাটফর্মটিতে একাধিক আধুনিক ফিচার অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। এতে থাকছে ‘সিঙ্গেল সাইন-অন’ (এসএসও) ব্যবস্থা, যার ফলে ব্যবহারকারীরা মাত্র একটি হিসাব বা অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে প্রবেশ করে একাধিক সরকারি সংস্থার সেবা গ্রহণ করতে পারবেন। আবেদনের সার্বিক প্রক্রিয়া স্বচ্ছ রাখতে যুক্ত করা হচ্ছে ‘নো ইউর অ্যাপ্রুভালস’ নামের একটি বিশেষ ড্যাশবোর্ড। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে লাইসেন্স ও পারমিটের আবেদন কোন পর্যায়ে রয়েছে, তা উদ্যোক্তারা সরাসরি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন।
এই প্রকল্পের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো নিবন্ধিত প্রতিটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি নির্দিষ্ট ‘ইউনিক বিজনেস আইডি’ (ইউবিআইডি) বা অনন্য ব্যবসা শনাক্তকরণ নম্বর চালু করা। আজীবন মেয়াদি এই অনন্য আইডি প্রবর্তনের ফলে সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে আন্তঃযোগাযোগ ও তথ্য আদান-প্রদান অত্যন্ত দ্রুত ও সহজ হবে। ফলে বিভিন্ন দপ্তর বা সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে একই প্রাতিষ্ঠানিক কাগজপত্র বারবার জমা দেওয়ার দীর্ঘদিনের জটিলতা দূর হবে, যা সামগ্রিক সেবা প্রদানের মান বহুলাংশে উন্নত করবে।
প্রকল্পটির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ধাপভিত্তিক কৌশলে পরিচালনা করা হচ্ছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে একটি প্রাথমিক ‘বিজনেস স্টার্টার প্যাক’ উন্মোচনের মাধ্যমে এর প্রথম পর্বের কাজ ইতোমধ্যে সূচিত হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ৯ থেকে ১২ মাসের মধ্যে শিল্প ও বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সেবাসমূহকে এই প্ল্যাটফর্মে পূর্ণাঙ্গভাবে একীভূত করা হবে। এছাড়া ২০৩০ সালের মধ্যে বিনিয়োগ সংক্রান্ত সকল প্রকার সেবাকে শতভাগ ডিজিটালে রূপান্তর করার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার।
বিশাল এই ডিজিটাল অবকাঠামোটি গড়ে তুলতে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) প্রয়োজনীয় কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করছে। অন্যদিকে প্রকল্পটির আইনি সুরক্ষা ও প্রশাসনিক বৈধতা সুসংহত করার লক্ষ্যে ‘ইনভেস্ট বাংলাদেশ অ্যাক্ট’-এর আওতায় প্রয়োজনীয় আইনি কাঠামো প্রস্তুতের কাজ চলছে।
সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ‘বাংলাবিজ’ প্রকল্প চালু হলে দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ ও ব্যবসায়িক পরিবেশ সূচকে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আসবে। ব্যবসায়িক প্রক্রিয়াগুলো দ্রুত, হয়রানিমুক্ত ও প্রযুক্তিনির্ভর হওয়ার মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দেশি-বিদেশি বড় অঙ্কের নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ করা সম্ভব হবে।


