সারাদেশ ডেস্ক
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) একটি আবাসিক হলের সংলগ্ন পুকুর থেকে এক শিক্ষার্থীর নিথর দেহ উদ্ধার করা হয়েছে। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ক্যাম্পাসের কবি কাজী নজরুল ইসলাম হল সংলগ্ন পুকুরে গোসল করতে নেমে পানিতে ডুবে ওই শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়। নিহত শিক্ষার্থীর নাম অর্ণব সাহা। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের যন্ত্রকৌশল (মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং) বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের একজন মেধাবী ছাত্র ছিলেন। সম্ভাবনাময় একজন ভবিষ্যৎ প্রকৌশলীর এমন আকস্মিক মৃত্যুতে পুরো বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস জুড়ে গভীর শোক ও বিষাদের ছায়া নেমে এসেছে।
প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষার্থী ও সহপাঠীদের বিবরণ অনুযায়ী, মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে দিনের কোলাহল যখন কমে আসছিল, তখন অর্ণব সাহা তাঁর কয়েকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সঙ্গে কবি কাজী নজরুল ইসলাম হলের পাশের পুকুরে গোসল করতে নামেন। সবাই যখন পানিতে অবস্থান করছিলেন, তখন সাঁতার কাটার একপর্যায়ে অর্ণব হঠাৎ করেই পানিতে তলিয়ে যান। তাঁর সঙ্গীরা শুরুতে বিষয়টি পুরোপুরি অনুধাবন করতে না পারলেও মুহূর্তের মধ্যেই তাঁর নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি তাদের নজরে আসে। আতঙ্কিত হয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধুরা তাঁর নাম ধরে ডাকাডাকি শুরু করেন। রাতের অন্ধকার নেমে আসায় মোবাইল ফোন এবং টর্চলাইটের আলো ফেলে পুকুরের পানিতে তাঁকে হন্যে হয়ে খুঁজতে থাকেন তারা। এ সময় বন্ধুদের আতঙ্কগ্রস্ত চিৎকার ও কোলাহল শুনে আশপাশের আবাসিক হলগুলো থেকে বিপুল সংখ্যক সাধারণ শিক্ষার্থী দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। এরপর অনেকেই পানিতে নেমে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। সম্মিলিতভাবে উদ্ধার তৎপরতার একপর্যায়ে পুকুরঘাটের কাছাকাছি পানির নিচ থেকে অর্ণবের নিথর দেহ উদ্ধার করতে সক্ষম হন এক শিক্ষার্থী।
উদ্ধারের পরপরই বিন্দুমাত্র কালক্ষেপণ না করে অর্ণবকে দ্রুত চুয়েটের নিজস্ব চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে উপস্থিত চিকিৎসক দল তাঁকে বাঁচিয়ে তোলার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালান। চুয়েট স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কর্তব্যরত চিকিৎসক ডা. রাজেশ দেব এই বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “ওই শিক্ষার্থীকে যখন আমাদের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে আসা হয়, তখন আমরা চিকিৎসায় ব্যবহৃত প্রয়োজনীয় সব ধরনের আধুনিক যন্ত্রপাতি নিয়ে সম্পূর্ণরূপে প্রস্তুত ছিলাম। নিয়ে আসার সাথে সাথেই তাঁকে জরুরি জীবন রক্ষাকারী চিকিৎসাপদ্ধতি বা সিপিআর (কার্ডিওপালমোনারি রিসাসিটেশন) দেওয়া হয়েছিল। আমরা সবদিক থেকেই চেষ্টা করেছি। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য যে, তাঁর শরীরে বেঁচে থাকার কোনো লক্ষণ অবশিষ্ট ছিল না।” চিকিৎসক আরও জানান, পানিতে বেশ কিছুক্ষণ ডুবে থাকার কারণে শ্বাসরোধ হয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আনার আগেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
স্বাস্থ্যকেন্দ্রের চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণের পরও সহপাঠী ও শিক্ষকদের শেষ আশা হিসেবে অর্ণবকে পরবর্তীতে চট্টগ্রামের একটি স্থানীয় হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। কিন্তু সেখানেও চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। হাসপাতালে সার্বক্ষণিক উপস্থিত থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মোয়াজ্জেম হোসাইন তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেন। গভীর শোক প্রকাশ করে তিনি বলেন, “তাকে সর্বশেষ চেষ্টা হিসেবে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছিল, কিন্তু সে আর আমাদের মাঝে বেঁচে নেই।” এই অনাকাঙ্ক্ষিত খবর ক্যাম্পাসে পৌঁছানোর পর সহপাঠী, শিক্ষক এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু সাধারণ শিক্ষার্থী এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের জন্য একটি গভীর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আবাসিক হলগুলোর সংলগ্ন পুকুরগুলো শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন গোসল বা অন্যান্য ব্যবহারের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ হলেও, এসব জলাশয়ে অনেক সময়ই পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা বা সতর্কতামূলক নির্দেশনা থাকে না। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর বা রাতে অন্ধকারে এসব পুকুরে নামা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা তারই একটি বড় এবং স্পষ্ট প্রমাণ।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ক্যাম্পাসের ভেতরের জলাশয়গুলোতে সাঁতার কাটা বা গোসল করার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া এবং কঠোর নিরাপত্তা নির্দেশিকা থাকা একান্ত প্রয়োজন। একইসঙ্গে, পুকুরঘাটগুলোতে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং গভীরতার সতর্কীকরণ সাইনবোর্ড স্থাপন করা হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রাণহানির দুর্ঘটনা অনেকাংশে এড়ানো সম্ভব হতে পারে।
একজন মেধাবী প্রকৌশল শিক্ষার্থীর অকাল প্রয়াণ তাঁর পরিবার, সহপাঠী এবং পুরো চুয়েট পরিবারের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। একটি সম্ভাবনাময় তরুণের এমন আকস্মিক ও মর্মান্তিক মৃত্যুতে শিক্ষার্থীদের মাঝে যেমন শোকের পরিবেশ তৈরি হয়েছে, তেমনি ক্যাম্পাসের সার্বিক নিরাপত্তা ও শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত সচেতনতা বৃদ্ধির বিষয়টিও নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। সাধারণত এ ধরনের ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়ে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের জলাশয় ব্যবহারের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে আরও সতর্ক ও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানানো হবে বলে সাধারণ শিক্ষার্থীরা প্রত্যাশা করছেন।


