সংরক্ষিত আসনের এমপি ফেরদৌসী আহমেদের পদত্যাগের ঘটনাকে প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে দলের জন্য একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন বিএনপি নেতারা।
তারা মনে করছেন, এর মাধ্যমে দলের নীতিনির্ধারকরা এমপি, মন্ত্রী ও জ্যেষ্ঠ নেতাদের একটি বার্তাই দিচ্ছেন, সেটি হলো নিজেদের এবং আশেপাশের মানুষের যেকোনো বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের দায়ভার তাদের নিতে হবে। তাই সবাইকে এখন অনেক বেশি সাবধানী হতে হবে।
তাদের মতে, ক্ষমতার অপব্যবহার, বিতর্কিত কর্মকাণ্ড কিংবা দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়—এমন যেকোনো কাজের জন্য দল বা সরকারে যেকোনো অবস্থানে থাকা ব্যক্তিদেরই শাস্তিমূলক বা রাজনৈতিক পরিণতির মুখোমুখি হতে হবে।
ফেরদৌসী আহমেদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, সপ্তাহখানেক আগে মিরপুরে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার ঘটনার সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা ছিল।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, দলের নেতাদের জড়িয়ে অতীতের বিভিন্ন বিতর্কের প্রেক্ষাপটে দলের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের এই চেষ্টাটি বেশি দেরি হয়ে গেল কি না।
মিরপুর-১ নম্বরের রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, লুটপাট ও আংশিক ভাঙচুরের ঘটনায় সৃষ্ট বিতর্কের জেরে বুধবার রাতে দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যখন তাকে সংসদ সদস্যের পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর নির্দেশ দেন, তখন অনেক বিএনপি নেতা ও সংসদ সদস্যই অবাক হয়েছিলেন।
গতকাল ফেরদৌসী আহমেদ পদত্যাগপত্র জমা দেন। এরপর তার আসনটি শূন্য ঘোষণা করা হয়েছে।
এর আগে, বুধবার রাতে বিএনপি ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির ৫১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করে। ওই কমিটিতে ফেরদৌসী যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
দলীয় নেতারা জানিয়েছেন, রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার অভিযোগ সরকার ও ক্ষমতাসীন দলকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলেছে এবং বিরোধীদের হাতে সমালোচনার সুযোগ বা অস্ত্র তুলে দিয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মন্ত্রী দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, একটি দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছিল।
দলীয় সূত্রমতে, ফেরদৌসীর ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত স্থানীয় কমিটির বেশ কয়েকজনের এই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ বিষয়টিকে আরও জটিল করে তোলে।
লক্ষ্মীপুর-১ আসনের বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিম দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘একটি বিতর্কিত জমি নিয়ে ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল। আর সংসদ সদস্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ড দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করেছে।’
তিনি আরও বলেন, ফেরদৌসীর পদত্যাগের সিদ্ধান্তটি একটি বড় বার্তা দিয়েছে। তার মতে, বিরোধী দলের রাজনীতিবিদ, আমলাসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে একই আইন ও জবাবদিহিতার আওতায় আনা উচিত।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, ‘অপরাধের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর অবস্থান অত্যন্ত কঠোর, আর এই সিদ্ধান্ত তা আবারও স্পষ্ট করে দিল। অপরাধী যেই হোক না কেন—দলের ভেতরে বা বাইরে—তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
আরেকজন বিএনপি নেতা বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী প্রথমে নিজের দল ও সরকারের ভেতরে বার্তা দিতে চান, পরে অন্য দলগুলোকে, যেন তাকে ভবিষ্যতে এই অভিযোগে অভিযুক্ত করা না যায় যে তিনি নিজের লোকদের প্রশ্রয় দিচ্ছেন বা দ্বিমুখী নীতি অনুসরণ করছেন।’
এর আগেও বিভিন্ন ইস্যুতে ক্ষমতাসীন দলের একাধিক সংসদ সদস্য এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উঠেছিল।
গত জুলাই মাসে শিল্প-কারখানার মালিকদের কাছে চাঁদা দাবির অভিযোগে ময়মনসিংহ-১১ আসনের এমপি ফখরুদ্দিন আহমেদ বাচ্চুকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় বিএনপি। তাকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তার অবস্থান ব্যাখ্যা করতে বলা হয়েছিল। তিনি অবশ্য সব অভিযোগ অস্বীকার করেন।
নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নানের ছেলে খাইরুল ইসলাম সজীবের বিরুদ্ধেও একই ধরনের অভিযোগ উঠেছিল। পুলিশ সজীবকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করে এবং পরে মুচলেকা নিয়ে তাকে পরিবারের জিম্মায় মুক্তি দেয়।
যুবদল তাকে বহিষ্কার করেছে। সজীব ও তার পরিবারের সদস্যরা অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দলের ভাবমূর্তির যে ক্ষতি হওয়ার, তা আগেই হয়ে গেছে এবং আরও আগে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হলে এই রাজনৈতিক মাশুল হয়তো কিছুটা কম হতো।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান ডেইলি স্টারকে বলেন, ফেরদৌসীর পদত্যাগের সিদ্ধান্তটি একটি জোরালো বার্তা হলেও, এটি আরও আগেই নেওয়া উচিত ছিল।
তিনি আরও বলেন, এ ধরনের পদক্ষেপ সংসদ সদস্য, মন্ত্রী এবং অন্যান্য পদধারীদের আরও সতর্ক করবে।
তিনি যোগ করেন, রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা ও ভাঙচুরের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেককে যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে চিহ্নিত করা উচিত।
বিএনপির জন্য পরবর্তী পরীক্ষা হলো—ভবিষ্যতের ঘটনাগুলোতেও তারা একই ধরনের অবস্থান বজায় রাখতে পারবে কি না এবং রাড্ডা তদন্তে যারা দোষী সাব্যস্ত হবে, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক আল মাসুদ হাসানুজ্জামান বলেন, ‘ফেরদৌসী আহমেদের পদত্যাগ একটি তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক প্রতিক্রিয়া মাত্র, কিন্তু এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—তদন্ত এবং আইনি প্রক্রিয়ায় শেষ পর্যন্ত কী ঘটে।’
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও দলীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, সরকার রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে চাঁদাবাজি, ভূমি দখল এবং অন্যান্য অপরাধের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ভাবছে।
তাদের পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে—অপরাধীদের একটি জাতীয় তথ্যভাণ্ডার হালনাগাদ করা এবং গোয়েন্দা সংস্থা, জেলা প্রশাসন ও পুলিশের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ের অপরাধীদের তালিকা তৈরি করা।

