রাজনীতি ডেস্ক
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা ও শহীদের রক্ত বৃথা যেতে দেওয়া হবে না উল্লেখ করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। যেকোনো ভয়ভীতি, প্রলোভন ও চাপ উপেক্ষা করে জনগণের অধিকার আদায়ে জামায়াতে ইসলামী মাঠে থাকবে বলে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) দুপুরে রাজধানীর ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স (আইডিবি) মিলনায়তনে এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার ও আহতদের সঙ্গে এই মতবিনিময় সভার আয়োজন করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
বক্তব্যে দেশের বিদ্যমান পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশের মানুষ একটি আমূল পরিবর্তন ও স্বৈরাচারমুক্ত বাংলাদেশ চেয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে ফের দেশকে পুরোনো অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেওয়ার অপচেষ্টা চলছে। বিগত রাজনৈতিক অধ্যায়ে দেশের শিক্ষাঙ্গনগুলোতে গেস্টরুম ও গণরুমের নামে নির্যাতন সেল গড়ে তোলা হয়েছিল। এমনকি নারীদের হলেও সাধারণ শিক্ষার্থীরা রেহাই পায়নি। ছাত্র-জনতার ত্যাগের বিনিময়ে দেশ সেই অন্ধকার থেকে মুক্ত হলেও বর্তমানে আবারও একই ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টির লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
জামায়াত আমির স্পষ্ট ভাষায় জানান, তাঁর দল কোনো অন্ধকার গলিপথে হাঁটবে না। জামায়াতে ইসলামী অতীতে যেমন জনগণের স্বার্থের বিপরীতে গিয়ে কোনো ধরনের আপস করেনি, ভবিষ্যতেও করবে না। সরকার গঠন না করা বা ক্ষমতায় না থাকা নিয়ে দলের কোনো আক্ষেপ নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, সংসদ ও রাজপথ—উভয় জায়গায় জামায়াতে ইসলামী দেশবাসী ও শহীদদের কণ্ঠস্বর হয়ে কাজ করে যাবে।
অতীতের বিভিন্ন প্রস্তাব ও রাজনৈতিক দরকষাকষির প্রসঙ্গ টেনে ডা. শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, জামায়াতকে বিভিন্ন সময় আপসের নানা প্রস্তাব ও প্রলোভন দেওয়া হয়েছে। কিন্তু দলীয় নীতি ও জনগণের ট্রাস্ট রক্ষা করতে গিয়ে জামায়াত সেসব প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। তিনি বলেন, গণভোটের মাধ্যমে প্রাপ্ত জনগণের রায়ই দেশের চূড়ান্ত ভিত্তি। এই গণরায় বাংলাদেশে বাস্তবায়িত হবেই এবং জামায়াতে ইসলামী নিজের অবস্থান থেকে একচুলও নড়বে না।
জুলাই আন্দোলনে সংঘটিত সহিংসতার বিচারের দাবিতে জামায়াত আমির অত্যন্ত দৃঢ় অবস্থান ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামী ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় বিশ্বাসী নয়, তবে অন্যায়ের বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। দেশে অতীতের রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের বিচার যেমন দীর্ঘদিন পর হলেও সম্পন্ন হয়েছে, তেমনি জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিরীহ ছাত্র-জনতার ওপর চালানো হত্যাকাণ্ডের বিচারও একদিন দেশের মাটিতে হবে। সময় যাই লাগুক না কেন, এই বিচারের দাবি থেকে সরবে না জামায়াত।
বিদ্যমান পরিস্থিতিতে জাতীয় ঐক্য ধরে রাখার স্বার্থে সরকারের প্রতি গঠনমূলক বার্তা দিয়ে তিনি বলেন, রাজনৈতিক দল, সরকার বা ব্যক্তি—ভুল সবারই হতে পারে। কিন্তু জাতির সঙ্গে দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা চরম বিশ্বাসঘাতকতার সামিল। সরকারকে অনড় অবস্থান ও রাজনৈতিক দোলাচল ছেড়ে সোজা পথে হেঁটে ছাত্র-জনতার মূল দাবি মেনে নেওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানান তিনি।
দেশে জুলাই আন্দোলনের আহত কর্মী ও সাধারণ মানুষের ওপর বিভিন্ন স্থানে ফের হামলা চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করে জামায়াত প্রধান বলেন, অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের ওপরও নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। তবে বুলেট, বারুদ ও ভয়ভীতি দেখিয়ে যুবসমাজ কিংবা জামায়াতকে দমানো যাবে না। ঈমানি শক্তি ও দেশপ্রেম নিয়ে নিরস্ত্র তরুণরা যেভাবে স্বৈরাচারের মোকাবিলা করেছিল, সেই চেতনাকে কোনো শক্তি স্তব্ধ করতে পারবে না। জাতির অধিকার রক্ষায় জামায়াতে ইসলামী বিন্দুমাত্র পিছপা হবে না এবং যেকোনো মূল্যে বীরের মতো বাঁচার চেতনাকে ধারন করবে।
আইডিবির কাউন্সিল হলে অনুষ্ঠিত এই মতবিনিময় সভায় জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কমিটির শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ, জুলাই আন্দোলনে নিহতদের স্বজন এবং গুরুতর আহত আন্দোলনকারীরা উপস্থিত ছিলেন। সভায় শহীদদের আত্মার মাগফিরাত ও আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করে বিশেষ দোয়া পরিচালনা করা হয়।


