গণভবন প্রাঙ্গণে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু ৫ আগস্ট

গণভবন প্রাঙ্গণে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু ৫ আগস্ট

জাতীয় ডেস্ক

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক পরিবর্তনের স্মারক হিসেবে অবশেষে চালু হতে যাচ্ছে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’। দীর্ঘ প্রতীক্ষা, নানামুখী আলোচনা ও বিভিন্ন প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পর আগামী ৫ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে এ জাদুঘরের শুভ উদ্বোধন হতে যাচ্ছে। গণভবন প্রাঙ্গণে নির্মিত এই ঐতিহাসিক স্মারক কেন্দ্রটির উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

বিগত ১৭ বছরের রাজনৈতিক শাসনকাল, গুম-খুন, বিরোধী মত দমন এবং ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসে সংঘটিত ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব আন্দোলনের ইতিহাস সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। আন্দোলনের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও দেশত্যাগের পর গণভবনকে একটি ঐতিহাসিক স্মারক জাদুঘরে রূপান্তরের দাবি ওঠে বিভিন্ন মহল থেকে। তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এ দাবির পরিপ্রক্ষিতে ভবনটিকে জাদুঘরে রূপান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করে। তবে প্রাথমিক পর্যায়ে প্রশাসনিক জটিলতা, পরিকাঠামো পরিবর্তন এবং নির্মাণ সংক্রান্ত নানা চ্যালেঞ্জের কারণে উদ্বোধনের নির্দিষ্ট তারিখ কয়েক দফা পিছিয়ে যায়।

মূলত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে তৎকালীন সরকারের পতনের পর গণভবনের নিয়ন্ত্রণ জনগণের হাতে চলে যায়। পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রীয় এই গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাটিকে কোনো ব্যক্তি বা শাসকের আবাসস্থল হিসেবে ব্যবহারের পরিবর্তে জনগণের দীর্ঘ সংগ্রাম, আত্মত্যাগ এবং প্রতিবাদের দলিল হিসেবে ধরে রাখার সিদ্ধান্ত হয়। জাদুঘরটিতে বিগত সরকারের শাসনকালের বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহ, আইনের অপব্যবহার, মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র এবং আন্দোলনের নানা স্মৃতিচিহ্ন সুসংগঠিতভাবে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

জুলাই স্মৃতি জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অসংখ্য দুর্লভ দলিল, শহীদদের ব্যবহৃত পোশাক, বিভিন্ন স্মারকপত্র, আন্দোলনের সময় ব্যবহৃত ব্যানার, প্ল্যাকার্ড এবং গণমাধ্যমের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আলোকচিত্র। এ ছাড়া গত ১৭ বছরের বিভিন্ন আলোচিত ও বিতর্কিত রাজনৈতিক ঘটনা, গুম ও নির্যাতনের নানা আলামত এ জাদুঘরে স্থান পেয়েছে, যা আগামীর প্রজন্মের কাছে তৎকালীন সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির একটি স্পষ্ট বিবরণ তুলে ধরবে।

জাদুঘরের পরিচালনা পর্যদের সভাপতি ও সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী এ বিষয়ে জানান, জাদুঘরটি নির্মাণের মূল উদ্দেশ্য হলো গণঅভ্যুত্থানের প্রকৃত চেতনা ও জনগণের ক্ষমতার বহির্প্রকাশকে ইতিহাস হিসেবে সংরক্ষণ করা। তিনি উল্লেখ করেন, এটি কেবল একটি ভবন নয়, বরং একটি রাষ্ট্রীয় স্মারক। কোনো শাসক যেন ভবিষ্যতে জনগণের অধিকার হরণ করে স্বৈরাচারী আচরণ করতে না পারে, এ জাদুঘর সেটির এক বড় স্মারক হিসেবে কাজ করবে। এটি প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রকৃত মালিক জনগণ এবং জনগণের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের মুখে যেকোনো অপশাসনের পতন অবধারিত।

জাদুঘর নির্মাণ ও এর প্রক্রিয়া চলাকালীন বিভিন্ন মাধ্যম থেকে দুর্নীতি ও অনিয়মের নানা প্রাথমিক অভিযোগ উঠেছিল। এ বিষয়ে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করে সংস্কৃতিমন্ত্রী জানান, দুর্নীতির যেকোনো অভিযোগ সুনির্দিষ্টভাবে উত্থাপিত হলে তা গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে। রাষ্ট্রীয় নীতি অনুযায়ী আইনগত তদন্তের মাধ্যমে যেকোনো অনিয়মের বিরুদ্ধে উপযুক্ত প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে সরকার।

উদ্বোধনের সব ধরনের কারিগরি ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। প্রদর্শনীর জন্য নির্ধারিত কক্ষ, স্মারক উপস্থাপনা এবং দর্শকদের চলাচলের পথ সুনির্দিষ্টভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে। জাতীয় ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় এই জাদুঘর চালুর মাধ্যমে দেশের গণতান্ত্রিক চর্চা এবং ইতিহাস সংরক্ষণে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে। আগামী ৫ আগস্ট আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের পরপরই সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য জাদুঘরটি উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে।

জাতীয় শীর্ষ সংবাদ