শিক্ষা ডেস্ক
রাজধানীর তিন বৃহৎ ও ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান—জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজ ও ঢাকা আলিয়া মাদরাসায় জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তির কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ব্যাপক ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, মারধর ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। আজ মঙ্গলবার দিনভর ছাত্রদল, ছাত্রশিবির, ছাত্রশক্তি ও জকসু নেতাদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘটিত এই সহিংসতায় তিন ক্যাম্পাসেই চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এতে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের একাধিক নেতাকর্মী গুরুতর আহত হয়েছেন, যাদের একটি অংশ পুরান ঢাকার ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এমনকি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহতদের ওপরও পুনরায় হামলার অভিযোগ উঠেছে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে সেমিনার কেন্দ্র করে সংঘাত
সংঘর্ষের সূত্রপাত ঘটে সকালে পুরান ঢাকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি) ক্যাম্পাসে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কর্তৃক কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে আয়োজিত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি বিষয়ক সেমিনারে প্রবেশ করাকে কেন্দ্র করে বাকবিতণ্ডা থেকে সহিংসতার সূচনা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (জকসু) প্রতিনিধি ও জাতীয় ছাত্রশক্তির নেতাকর্মীরা বিভিন্ন দাবিসংবলিত প্ল্যাকার্ড নিয়ে মিলনায়তনে প্রবেশের চেষ্টা করলে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা তাদের বাধা দেন। এ নিয়ে উভয়পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়।
সেমিনার শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনারের সামনে সংঘাত আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। সেখানে জকসু ও ছাত্রশক্তির নেতাকর্মীদের সঙ্গে ছাত্রদলের সংঘর্ষ বাধে। পরবর্তীতে বিকেলে ছাত্রশক্তির নেতাকর্মীদের সঙ্গে ছাত্রদলের সংঘর্ষ অব্যাহত থাকে। জকসুর ভিপি ও ছাত্রশিবির নেতা রিয়াজুল ইসলাম অভিযোগ করেন, প্রক্টোরিয়াল টিম ও ছাত্রদলের যৌথ বাধায় সাধারণ শিক্ষার্থীরা সেমিনারে ঢুকতে পারেননি। বাধা দিতে গেলে তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে ক্যাম্পাস থেকে বের করে দেওয়া হয়। এছাড়া জাতীয় ছাত্রশক্তি জবি শাখার সভাপতি শাহিন মিয়ার দাবি, ছাত্রদলের অতর্কিত হামলায় জকসুর ভিপি, জিএস, এজিএস এবং ছাত্রশক্তির সাধারণ সম্পাদক ফেরদৌস শেখ মারাত্মক আহত হয়েছেন।
অন্যদিকে হামলার দায় অস্বীকার করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের আহ্বায়ক মেহেদী হাসান হিমেল জানান, প্রধান অতিথির উপস্থিতিতে একটি সুশৃঙ্খল অনুষ্ঠানে ছাত্রশিবির ও তাদের মিত্র সংগঠনগুলো পরিকল্পিতভাবে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করে। বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধ করতে গিয়ে ছাত্রদলের বেশ কয়েকজন সদস্যও আহত হয়েছেন। দিনভর সংঘাতের পর জবি ক্যাম্পাসে রাতেও থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছিল।
ঢাকা কলেজে সংবর্ধনা প্রস্তুতিতে হামলা ও পাল্টা ধাওয়া
পুরান ঢাকার উত্তেজনার আবহ ছড়িয়ে পড়ে রাজধানীর ঢাকা কলেজ ক্যাম্পাসেও। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ক্যাম্পাসের গ্যালারি-২ এলাকায় ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ ঘটে। ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে জানানো হয়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে শহীদ পরিবারের সদস্যদের জন্য আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের চূড়ান্ত প্রস্তুতির সময় ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা তাদের ওপর হামলা চালায়। হামলায় ঢাকা কলেজ শিবিরের শাখা অফিস সম্পাদক আব্দুল মালেক মাথায় গুরুতর আঘাত পান এবং তাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
পাল্টা অভিযোগে ঢাকা কলেজ ছাত্রদলের সদস্য সচিব মিল্লাদ হোসেন জানান, শিবিরের বহিরাগত কর্মীরা সকালে ক্যাম্পাসে উসকানিমূলক মহড়া দেয় এবং ছাত্রদলের এক কর্মীকে মারধর করে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার স্বার্থেই ছাত্রদল ক্যাম্পাসে অবস্থান নেয়। ঘটনার পর পরই ছাত্রদল ঢাকা কলেজের প্রধান ফটকের সামনে বিক্ষোভ মিছিল পরিচালনা করে এবং ক্যাম্পাসের বিভিন্ন মোড়ে অবস্থান জোরদার করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ঢাকা কলেজ প্রশাসন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় তদারকি বৃদ্ধি করেছে বলে নিশ্চিত করেছেন অধ্যক্ষ অধ্যাপক এ কে এম ইলিয়াস।
ঢাকা আলিয়া মাদরাসায় সংঘর্ষ ও হাসপাতালে হামলা
দিনের শেষ ভাগে পুরান ঢাকার বকশিবাজারে অবস্থিত সরকারি ঢাকা আলিয়া মাদরাসা ক্যাম্পাসেও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। বিকেলে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের কর্মসূচি পালনকে কেন্দ্র করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘাত শুরু হয়। এতে আলিয়া মাদরাসা ছাত্রদলের সাবেক সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সানাউল্লাহ এবং লালবাগ থানা ছাত্রদলের সদস্য সচিব নিছার উদ্দিন রাব্বিসহ একাধিক নেতাকর্মী গুরুতর রক্তাত হন। তাদের দ্রুত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।
এদিকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংঘর্ষের জের ধরে বিকেলে পুরান ঢাকার ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগেও এক নজিরবিহীন হামলার ঘটনা ঘটে। অভিযোগ উঠেছে, দুপুরে জবি ক্যাম্পাসে আহত ছাত্রশক্তি ও শিবিরের নেতাকর্মীরা যখন ওই হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা নিচ্ছিলেন, তখন বিকেল পৌনে ৫টার দিকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বহিরাগতদের নিয়ে হাসপাতালের ভেতর তাণ্ডব চালায়। তারা জরুরি বিভাগের চিকিৎসা কক্ষ থেকে আহতদের টেনেহিঁচড়ে বাইরে বের করে এনে পুনরায় বেধড়ক মারধর করে।
একই দিনে রাজধানীর তিনটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সংঘটিত এসব সংঘাতময় পরিস্থিতিতে সাধারণ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ঢাকা মহানগর পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশাসন সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সার্বিক নিরাপত্তা বজায় রাখতে এবং সহিংসতা রোধে পুলিশ মোতায়েন জোরদার করা হয়েছে এবং ঘটনার তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।


