জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অর্জনকে কোনো বিশেষ দল বা গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে এর জাতীয় চেতনা ধারণ করার আহ্বান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি স্পষ্ট ভাষায় হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, জুলাইয়ের ঐতিহাসিক অর্জনকে কেন্দ্র করে কোনো রূপ সংকীর্ণ রাজনৈতিক টানাটানি বা বিভাজন সৃষ্টি করা হলে এই মহান গণঅভ্যুত্থান শেষ পর্যন্ত কারও থাকবে না। বুধবার (৫ আগস্ট) ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস-২০২৬’ উপলক্ষে আয়োজিত শহীদ পরিবার ও আন্দোলনের বীর সেনানীদের সম্মাননা ও সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
রাজধানীতে আয়োজিত এই সংবর্ধনা ও আলোচনা সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব আত্মত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত বিজয় কোনো একটি দলের একক কৃতিত্ব নয়, বরং এটি সমগ্র দেশের জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সংগ্রামের ফসল। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে এই আন্দোলনের একক কৃতিত্ব দাবি করার যে প্রতিযোগিতা দেখা যাচ্ছে, তা অনাকাঙ্ক্ষিত। তিনি উল্লেখ করেন, দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি এবং বর্তমান সরকার জুলাইয়ের শহীদদের রক্তস্নাত চেতনা এবং ‘জুলাই সনদের’ প্রতিটি অংশের পূর্ণ বাস্তবায়নে সম্পূর্ণরূপে অঙ্গীকারবদ্ধ।
আন্দোলনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা কিংবা কেবল ৩৬ দিনের আন্দোলন ছিল না। এর সূচনার প্রেক্ষাপট রচিত হয়েছিল ২০০৯ সাল থেকেই, যখন দেশে একদলীয় শাসনব্যবস্থা জোরদার করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। দীর্ঘ দেড় দশক ধরে জনগণের মৌলিক অধিকার হরণ, মিথ্যা মামলা, জেল-জুলুম এবং সর্বব্যাপী দমন-পীড়নের মাধ্যমে যে দমবন্ধ পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছিল, জুলাইয়ের অভ্যুত্থান ছিল তার বিরুদ্ধে গোটা জাতির পুঞ্জীভূত ক্ষোভের চূড়ান্ত রূপ। সে সময় দেশের শীর্ষস্থানীয় গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব কারাগারে বন্দি থাকা অবস্থায় প্রবাসে থাকা নেতৃত্বের সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা আন্দোলনকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সাম্প্রতিক শাসন ব্যবস্থার তুলনা টেনে মন্ত্রী বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করেছে এবং পরিশেষে গণরোষ থেকে আত্মরক্ষায় শেখ হাসিনাকে দিল্লিতে পালিয়ে যেতে হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, ‘৭১-এর চেতনাকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করতে করতে শেষ পর্যন্ত স্বৈরাচারকে দেশ ছাড়তে হয়েছে। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের ক্ষেত্রেও সে ধরণের ভুল বা অপব্যবহার কোনোভাবেই কাম্য নয়। গণভোটে জনগণের প্রদত্ত সুনির্দিষ্ট রায় বাস্তবায়নে এবং রাষ্ট্র পুনর্গঠনে দেশের সকল অংশীজনকে অবিলম্বে এক টেবিলে আলোচনার টেবিলে বসার আহ্বান জানান তিনি।
সংবিধান সংস্কার এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন বিষয়ে সরকারের পরিকল্পনা ব্যক্ত করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকার দেশের সর্বস্তরের নাগরিক, আইন বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক দলগুলোর মতামতের ভিত্তিতে সংবিধানে একটি স্থায়ী ও দীর্ঘমেয়াদী পরিবর্তন আনতে চায়। এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ সাংবিধানিক কাঠামো তৈরি করার লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো রাজনৈতিক দল ক্ষমতার অপব্যবহার করে আর স্বৈরাচারী ব্যবস্থা কায়েম করতে না পারে এবং দেশের গণতান্ত্রিক ধারা বাধাগ্রস্ত না হয়।
আওয়ামী লীগের দলীয় অবস্থান ও বিচার প্রক্রিয়া সম্পর্কিত আলোচনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কঠোর বক্তব্য দিয়ে বলেন, গণহত্যা ও ফ্যাসিবাদের জন্য দায়ী রাজনৈতিক দলের পরিণতি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক আইন এবং আদালত নির্ধারণ করবে। যাদের হাত জনগণের রক্তে রঞ্জিত, তাদেরকে অবশ্যই আদালতে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে এবং জবাবদিহি করতে হবে। তিনি আরও বলেন, ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে এবং আওয়ামী লীগের অপশাসনের পুনরাবৃত্তি রোধে দেশের সাধারণ জনগণ ও সকল গণতান্ত্রিক দল আজ পুরোপুরি একাট্টা। গণতান্ত্রিক চর্চায় সংসদের ভেতরে কিংবা বাইরে বিভিন্ন নীতি ও ইস্যু নিয়ে দলগুলোর মধ্যে তর্ক-বিতর্ক ও ভিন্নমত থাকাটাই স্বাভাবিক, কিন্তু স্বৈরাচারের পুনরুত্থান প্রতিহত করার প্রশ্নে পুরো দেশ আজ ইস্পাতকঠিন ঐক্যে আবদ্ধ।
অনুষ্ঠানে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানানো হয় এবং শহীদ পরিবারের সদস্য ও আহত যোদ্ধাদের হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেওয়া হয়। সংবর্ধনা সভায় বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং আন্দোলনকারী বিভিন্ন সংগঠনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।


