জাতীয় ডেস্ক
ফরিদপুর: বৈষম্যবিরোধী জুলাই ছাত্র-জনতার আন্দোলন কেবল সরকারি চাকরির কোটা সংস্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা ছিল দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা গুম, খুন, শাসন-শোষণ ও স্বৈরাচারী ব্যবস্থার চিরতরে অবসান ঘটানোর এক ঐতিহাসিক মহাসংগ্রাম। এই ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের সাফল্য কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা একক দলের অর্জিত সাফল্য নয়; এটি বাংলাদেশের ১৮ কোটি আপামর জনতার বহুল আকাঙ্ক্ষিত ও ঐক্যবদ্ধ লড়াইয়ের সমষ্টিগত বিজয় বলে মন্তব্য করেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।
বুধবার ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার শহীদ আকরামুননেছা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে স্থানীয় বিএনপি আয়োজিত ‘জুলাই বিজয় র্যালি’ পরবর্তী বিশাল জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। গণ-অভ্যুত্থানের মূল্যবোধ ও চেতনাকে ধারণ করে বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার পুন ব্যক্ত করেন তিনি।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ দেশের রাজনৈতিক পটভূমি ও গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার চিত্র তুলে ধরে বলেন, বিগত বছরগুলোতে দেশের মানুষ ক্রমাগত নাগরিক অধিকার, ভোটাধিকার এবং বাকস্বাধীনতা হারিয়েছে। জুলাই মাসের বিপ্লব ছিল সেই দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ ও নিষ্পেষণের এক স্বতঃস্ফূর্ত এবং চূড়ান্ত রাজনৈতিক বহিঃপ্রকাশ। তরুণ ছাত্র সমাজ এবং সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ রাজপথে নেমে অসীম সাহস ও আত্মত্যাগের পরিচয় দিয়ে স্বৈরাচারী শাসনকাঠামোর শক্ত ভিত গুঁড়িয়ে দিয়েছে। শহীদদের অসামান্য আত্মত্যাগ এবং আহতদের অবদান স্মরণ করে তিনি যোগ করেন, যে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে রাজপথে রক্ত ঝরেছে, সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে দেশ গঠনে সবাইকে সমান দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
বক্তব্যে তিনি দেশের চলমান সংস্কার কার্যক্রম ও প্রশাসনিক পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। শামা ওবায়েদ উল্লেখ করেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে জাতীয় ঐক্য রক্ষা করা রাজনৈতিক দল ও সাধারণ নাগরিক—উভয়ের জন্যই সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। দেশের প্রতিটি নাগরিকের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুরক্ষা নিশ্চিত করাই বর্তমান সময় ও রাজনীতির মূল প্রাতিষ্ঠানিক লক্ষ্য হওয়া উচিত। সমাজে বৈষম্যের অবসান ঘটিয়ে একটি ন্যায়ভিত্তিক ও সুশাসিত রাষ্ট্র গঠনে তিনি স্থানীয় জনগণ ও রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের এক হয়ে কাজ করার প্রতি আহ্বান জানান।
বৈদেশিক সম্পর্ক ও বিশ্ব দরবারে দেশের অবস্থান প্রসঙ্গের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি জানান, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের পর গঠিত বর্তমান প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা দেশের সার্বভৌমত্ব ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল করতে সহায়তা করছে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং জাতীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার বিকল্প নেই। অতীতে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘন ও রাজনৈতিক নিপীড়নের মতো ঘটনার যেন আর কখনো পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে বিষয়ে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে সর্বোচ্চ সচেতন থাকার বার্তা দেন তিনি।
নগরকান্দা উপজেলা বিএনপির সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হাবিবুর রহমান বাবুল তালুকদারের সভাপতিত্বে আয়োজিত এই জনসভায় স্থানীয় ও জেলা পর্যায়ের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। সভায় বক্তারা তৃণমূল পর্যায়ে রাজনৈতিক সংহতি বজায় রাখা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটানো এবং সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য প্রদান করেন।
সমাবেশে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বক্তব্য প্রদান করেন জেলা বিএনপির সভাপতি সৈয়দ মোদাররেস আলী ইছা। এ ছাড়াও বক্তব্য রাখেন উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাইফুর রহমান মুকুল এবং উপজেলা বিএনপির বর্তমান সাংগঠনিক সম্পাদক শওকত আলী শরীফ। জনসভা শেষে এলাকার প্রধান প্রধান সড়কে একটি বর্ণাঢ্য র্যালি প্রদক্ষিণ করে, যেখানে উপজেলা বিএনপি ও এর অঙ্গ-সংগঠনের হাজার হাজার নেতা-কর্মী এবং সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ অংশ নেন।


