পিরোজপুরে মাদ্রাসার নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ: সুপারের বিরুদ্ধে পুরানো জালিয়াতি ও স্বেচ্ছাচারিতার তথ্য প্রকাশ্যে

পিরোজপুরে মাদ্রাসার নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ: সুপারের বিরুদ্ধে পুরানো জালিয়াতি ও স্বেচ্ছাচারিতার তথ্য প্রকাশ্যে

সারাদেশ ডেস্ক
পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার এস এম দারুচ্ছুন্নাত দাখিল মাদ্রাসায় অফিস সহকারী-কাম-কম্পিউটার এবং অফিস সহায়ক পদে জনবল নিয়োগকে কেন্দ্র করে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে পূর্বনির্ধারিত প্রার্থীদের নিয়োগ দেওয়ার চক্রান্ত, সরকারি ছুটির দিনে আবেদনপত্র গ্রহণ করে প্রকৃত যোগ্য প্রার্থীদের বঞ্চিত করা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধা ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের অভিযোগ এনেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও চাকরিপ্রার্থীরা। একইসঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির সুপারের বিরুদ্ধে অতীতে জালিয়াতি, তথ্য গোপন ও সরকারি তদন্তে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার নথি প্রকাশ্যে আসায় প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
ঘটনার বিবরণ থেকে জানা যায়, গত ৫ মার্চ ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির পর থেকেই অনিয়মের সূচনা ঘটে। স্থানীয় বাসিন্দা ও অফিস সহকারী-কাম-কম্পিউটার অপারেটর পদের নিয়োগপ্রার্থী মো. রাসেল মিনা অভিযোগ করেন যে, প্রাতিষ্ঠানিক ছুটির দিনে আবেদনপত্র গ্রহণের কারণে অনেক যোগ্য প্রার্থী আবেদন করা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। পুরো প্রক্রিয়াটিতে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে পছন্দের প্রার্থী নির্ধারণের চেষ্টা চলছে উল্লেখ করে তিনি মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরে লিখিত অভিযোগ জমা দেন। অভিযোগে চলমান নিয়োগ কার্যক্রম অবিলম্বে স্থগিত করে নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হয়েছে। এই অনিয়মের প্রতিবাদে সম্প্রতি স্থানীয় বাসিন্দারা মাদ্রাসার সামনে সুপারের অপসারণের দাবিতে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন।
নিয়োগ বিতর্কের মাঝেই প্রতিষ্ঠানের সুপার মাওলানা মো. আব্দুল মান্নানের অতীত কর্মকাণ্ডের একটি চাঞ্চল্যকর সরকারি তদন্ত নথি সামনে এসেছে। ২০১৬ সালের ২৫ আগস্ট নাজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. তবিবুর রহমান কর্তৃক প্রস্তুতকৃত এক তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা যায়, সুপার আব্দুল মান্নানের নিজস্ব নিয়োগ ও এমপিওভুক্তি প্রক্রিয়ায় প্রাথমিক অনিয়ম ধরা পড়েছিল। তৎকালীন নথিতে আরও উল্লেখ রয়েছে, ২০০৫ সালের একটি ভুয়া রেজুলেশন তৈরি এবং নাজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির স্বাক্ষর জাল করে মো. ইলিয়াস হোসেন নামের এক ব্যক্তিকে সহকারী মৌলভী হিসেবে অবৈধভাবে নিয়োগ ও এমপিওভুক্ত করা হয়েছিল। সরকারি সেই তদন্তে জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়ায় জড়িতদের এমপিও বাতিল ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয় এবং তৎকালীন ম্যানেজিং কমিটি সুপার আব্দুল মান্নানকে সাময়িক বরখাস্ত করে।
শিক্ষার্থী ও স্থানীয় অভিভাবকদের আরও অভিযোগ, মাদ্রাসার ছাত্রীদের ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত কমন রুমটি দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে। নিয়মবহির্ভূতভাবে সেখানে খাট, আলমারি ও রান্নাবান্নার সরঞ্জাম রেখে সুপার নিজ বাসস্থান হিসেবে ব্যবহার করছেন। এতে প্রতিষ্ঠানের সাধারণ শিক্ষাকার্যক্রম ও নারী শিক্ষার্থীদের মৌলিক সুযোগ-সুবিধা ব্যাহত হচ্ছে।
এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে সুপার মো. আব্দুল মান্নান তা অস্বীকার করার বদলে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ দেখান। তিনি জানান, অতীতেও তাঁর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ হলেও কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা কার্যকর হয়নি এবং তাঁর নিজস্ব প্রভাবশালী মহল রয়েছে।
অন্যদিকে, পিরোজপুর জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. ইদ্রিস আলী আযিযী জানিয়েছেন যে তাঁরা লিখিত অভিযোগ হাতে পেয়েছেন। তিনি আশ্বাস দেন, তদন্ত সাপেক্ষে অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা, পুরোনো জালিয়াতির নথির প্রশাসনিক অগ্রগতি স্পষ্ট করা এবং বর্তমান নিয়োগ প্রক্রিয়ায় পূর্ণ স্বচ্ছতা নিশ্চিতে সংশ্লিষ্ট উচ্চপদস্থ কর্তৃপক্ষের অবিলম্বে হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিক ও অভিবাবকবৃন্দ।
শীর্ষ সংবাদ সারাদেশ