ফটিকছড়িতে বাবুনগরী-তারেক রহমান বৈঠক: আলেমদের ৯ দফা দাবি পেশ

ফটিকছড়িতে বাবুনগরী-তারেক রহমান বৈঠক: আলেমদের ৯ দফা দাবি পেশ

জাতীয় ডেস্ক

কওমি কওমি ঘরানার প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায় এই দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

রোববার বিকেলে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে সরকারের মন্ত্রী ও প্রশাসনের প্রতিনিধি ছাড়াও হেফাজতে ইসলামের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। চট্টগ্রাম অঞ্চলের রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে এই সফরকে কেন্দ্র করে ব্যাপক আগ্রহের সৃষ্টি হয়েছে।

বিকেল সোয়া চারটার দিকে প্রধানমন্ত্রী বাবুনগর মাদ্রাসায় পৌঁছালে তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানানো হয়। পরবর্তীতে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে মহান আল্লাহ, রাসুল (সা.), পবিত্র কোরআন ও ইসলাম ধর্মের অবমাননা রোধে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রেখে জাতীয় সংসদে আইন পাস করাসহ সরকারের কাছে ৯ দফা প্রস্তাবনা ও দাবি পেশ করে হেফাজতে ইসলাম। সংগঠনটির মহাসচিব সাজিদুর রহমান লিখিত অভিনন্দনপত্রের মাধ্যমে এই দাবিগুলো সরকারের শীর্ষপর্যায়ে তুলে ধরেন।

হেফাজতে ইসলামের পক্ষ থেকে পেশকৃত দাবিগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য রয়েছে— ধর্মীয় অবমাননা প্রতিরোধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ, কোরআন ও সুন্নাহর বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো আইন প্রণয়ন না করা, এবং ২০১৩ সালের মে মাসে রাজধানীর শাপলা চত্বরে সংঘটিত ঘটনা, ২০২১ সালের মোদিবিরোধী আন্দোলন ও ২০২৪ সালের রাজনৈতিক সহিংসতার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত সাপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করা। এছাড়া আলেম সমাজের বিরুদ্ধে বিগত সরকারের আমলে দায়ের করা সব মামলা প্রত্যাহারের জোর দাবি জানানো হয়।

শিক্ষাক্ষেত্রে কওমি মাদ্রাসা শিক্ষার মান উন্নয়ন ও শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়েও দাবি উত্থাপিত হয়। দাওরায়ে হাদিসের সনদের যে সমমান প্রদান করা হয়েছিল, তা কার্যকর করে কওমি শিক্ষার্থীদের দেশের অভ্যন্তরে ও বিদেশে উচ্চশিক্ষা এবং সরকারি চাকরিতে নিয়োগের সুযোগ তৈরির তাগিদ দেওয়া হয়। বিশেষ করে সরকারি বিভিন্ন সংস্থায় ধর্মীয় শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে কওমি মাদ্রাসা ডিগ্রিধারীদের আবেদনের সুযোগ রাখার আবেদন জানানো হয়। একই সঙ্গে প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য ইসলাম ধর্ম শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার দাবি জানানো হয়েছে।

সামাজিক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার অংশ হিসেবে কয়েকটি নির্দিষ্ট বিষয়ে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে হেফাজতে ইসলাম। এর মধ্যে রয়েছে বিতর্কিত ধর্মীয় গোষ্ঠীর প্রকাশ্য সামাজিক ও প্রচারণামূলক কর্মকাণ্ড রোধ করা, পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে বিদেশি বিভিন্ন সংস্থার অপতৎপরতা বন্ধ এবংTabligh Jamaat ও টঙ্গী বিশ্ব ইজতেমা কেন্দ্রিক আলেমদের মতামতকে প্রাধান্য দিয়ে নীতি নির্ধারণ করা।

বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল এবং স্থানীয় সংসদ সদস্য সরোয়ার আলমগীর। অন্যদিকে হেফাজতে ইসলামের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন সংগঠনটির মহাসচিব সাজিদুর রহমানসহ শীর্ষ পর্যায়ের উলামায়ে কেরাম ও স্থানীয় মাদ্রাসার পরিচালনা পর্ষদের সদস্যবৃন্দ।

জমা দেওয়া অভিনন্দনপত্রে ফটিকছড়ি ও বাবুনগর মাদ্রাসার সামাজিক ও ধর্মীয় অবদানের ঐতিহাসিক পটভূমি স্মরণ করা হয়। দ্বীনি শিক্ষা সম্প্রসারণে আল্লামা শাহ আহমদ শফী ও আল্লামা হাফেজ জুনায়েদ বাবুনগরীর অবদান উল্লেখের পাশাপাশি অতীতের রাজনৈতিক প্রেক্ষিত এবং ইসলামিক মূলবোধ গঠনে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের পদক্ষেপগুলোর মূল্যায়ন করা হয়। বৈঠকে উপস্থিত আলেম সমাজ দেশের স্থিতিশীলতা, সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্রের উন্নয়নমূলক কাজে ধর্মীয় মূল্যবোধের সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।

দ্বিপক্ষীয় আলোচনার বিস্তারিত সরকার কিংবা সংশ্লিষ্ট সংগঠনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জনসমক্ষে পুরোপুরি প্রকাশ করা না হলেও, দুই পক্ষের এই মতবিনিময়কে রাষ্ট্র ও দেশের বৃহৎ আলেম সমাজের মধ্যকার সংলাপ হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ মনে করা হচ্ছে। সরকার প্রধানের এই সফর ও বৈঠক ফটিকছড়িসহ সমগ্র চট্টগ্রাম অঞ্চলের সার্বিক শান্তিশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক আবহাওয়ায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

জাতীয় শীর্ষ সংবাদ