আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে নতুন আন্তর্জাতিক নৌপথ নির্ধারণ নিয়ে ওমানের সঙ্গে একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে ইরান। তবে বহুল আলোচিত ও সামুদ্রিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথটি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পুনরায় উন্মুক্ত করার বিষয়টি এখনই বাস্তবায়িত হচ্ছে না। তেহরানের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ না করা পর্যন্ত এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ বন্ধই রাখা হবে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী সমুদ্রসীমায় আন্তর্জাতিক চলাচল ও সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনা করে নতুন নৌপথ নির্ধারণের একটি রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে। খসড়া চুক্তিটি চূড়ান্ত হলে এবং পরবর্তীতে মার্কিন প্রশাসন ইরানের উত্থাপিত শর্তাবলী মেনে নিয়ে আন্তর্জাতিক নৌচলাচল পুনরায় স্বাভাবিক করার সিদ্ধান্ত নিলে, বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনকারী নৌযানগুলো এই নতুন নির্ধারিত রুট ব্যবহার করবে। প্রস্তাবিত চুক্তিতে প্রণালী অতিক্রমকারী আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ, জ্বালানি তেলবাহী ট্যাংকার ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহনকারী নৌযানগুলোর নিরাপদ রুটের সার্বিক নির্দেশনা বিস্তারিতভাবে উল্লেখ রয়েছে।
বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ এই আন্তর্জাতিক জলপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অঙ্গনে ও জ্বালানি বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক উত্তেজনা ও সামরিক সংঘাতের জের ধরে ইরান তাদের সার্বিক নিরাপত্তা ও কৌশলগত সুবিধার অংশ হিসেবে প্রণালী দিয়ে নৌযান চলাচল অবরুদ্ধ করে দেয়। ইতিপূর্বে বিশ্বের মোট ব্যবহৃত তেল ও এলএনজির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই একক সংবেদনশীল নৌপথটি দিয়ে বিশ্ববাজারে পরিবাহিত হতো। ফলে হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ হওয়ার পর থেকেই বিশ্বব্যাপী অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ শিকল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দর বৃদ্ধির কারণে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটে দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দেশের মধ্যেও সম্পর্কের বরফ গলেনি। ইরানের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সরাসরি কোনো দ্বিপক্ষীয় আলোচনা বা সংলাপ অনুষ্ঠিত হচ্ছে না। তেহরানের অভিযোগ, ওয়াশিংটন জুনে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তীকালীন আন্তর্জাতিক সমঝোতার শর্ত ভঙ্গ করেছে। যতক্ষণ পর্যন্ত ওয়াশিংটন সেই অবস্থান থেকে সরে এসে চুক্তি বাস্তবায়নে আন্তরিকতা প্রদর্শন না করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো সরাসরি আলোচনায় সম্মত হবে না ইরান। তবে সরাসরি বৈঠক বন্ধ থাকলেও অঞ্চলটির মধ্যস্থতাকারী বিভিন্ন দেশের মাধ্যমে দুই পক্ষের মধ্যে প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক বার্তা আদান-প্রদান অব্যাহত রয়েছে।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকেও কৌশলগত অবস্থান বজায় রাখা হচ্ছে। ওয়াশিংটনের উচ্চপর্যায়ের কৌশলগত পর্যালোচনায় উঠে এসেছে যে, তারা তেহরানের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতি এবং আর্থিক সংকটের সামগ্রিক দিকগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। সরাসরি কোনো চুক্তি বা শিথিলতার দিকে না গিয়ে ইরানকে একটি সার্বিক চাপের মুখে রেখে কূটনৈতিক মধ্যস্থতা চালিয়ে যাওয়ার নীতিই গ্রহণ করেছে মার্কিন নীতি নির্ধারকরা।
কৌশলগত ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে হরমুজ প্রণালীর ভৌগোলিক গুরুত্ব অপরিসীম। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের মধ্যবর্তী এই সংকীর্ণ প্রণালীটি মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান তেল উৎপাদক দেশগুলোর জন্য বিশ্ববাজারে জ্বালানি রপ্তানির একমাত্র প্রধান সমুদ্রপথ। সামুদ্রিক নিরাপত্তা রক্ষা এবং ওমানের সঙ্গে যৌথভাবে নতুন নৌপথ নিশ্চিত করার এই চুক্তি যদি শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়, তবে তা বৈশ্বিক জ্বালানি খাতের অনিশ্চয়তা কাটাতে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে বিশ্ব বাণিজ্যের সার্বিক সুরক্ষার স্বার্থে প্রণালীটি দ্রুত পুরোপুরি উন্মুক্ত করার জন্য আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহল থেকে জোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।


