আন্তর্জাতিক ডেস্ক
দক্ষিণ আমেরিকার দেশ কলম্বিয়ায় এক শক্তিশালী ভূমিকম্পে ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞের ঘটনা ঘটেছে। গত সোমবার ভূখণ্ডটিতে আঘাত হানা ৭ দশমিক ৪ মাত্রার ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর ধসে পড়া বিভিন্ন ভবনের ধ্বংসস্তূপ থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ২৫০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকায় মৃতের সংখ্যা আরও বহু বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা করছে কর্তৃপক্ষ। ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও বিপুল সংখ্যক মানুষ আটকা পড়ে আছেন।
জরুরি উদ্ধারকারী দল ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, উদ্ধারকাজ জোরদার করার সঙ্গে সঙ্গে নিহতের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। বিভিন্ন এলাকার ধ্বংসস্তূপ থেকে মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত অন্তত ২৫৪ জনের মরদেহ উদ্ধারের খবর পাওয়া গেছে। ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে দেশটির পশ্চিমাঞ্চলীয় পার্বত্য শহর পেরেইরাতে। সেখানে এখন পর্যন্ত ১০১ জনের প্রাণহানির বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। এর পরেই দ্বিতীয় সর্বোচ্চ হতাহতের ঘটনা ঘটেছে দেশটির অন্যতম বৃহত্তম এবং গুরুত্বপূর্ণ শহর কালিতে।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত সোমবার ভূ-কম্পনটি আঘাত হানে। শক্তিশালী এই ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল ছিল দেশটির রাজধানী বোগোটা থেকে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার পশ্চিমে চোকো প্রদেশের সান হোসে দেল পালমার এলাকায়, ভূপৃষ্ঠের ১০৭ কিলোমিটার গভীরে। মূল ভূ-কম্পনের পর চোকো ও আশপাশের অঞ্চলে অন্তত ২১টি মৃদু ও মাঝারি মাত্রার আফটারশক (অনুকম্পন) অনুভূত হয়, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে মারাত্মক আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয় এবং উদ্ধারকাজ ব্যাহত করে।
সম্প্রতি শপথ নেওয়া দেশটির নতুন প্রেসিডেন্ট অ্যাবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েল্লার সরকারের জন্য এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। শপথ গ্রহণের মাত্র তিন দিনের মাথায় এই ভয়াবহ দুর্যোগের মুখোমুখি হন তিনি। পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রেসিডেন্ট ইতোমধ্যে দুর্যোগকবলিত এলাকা, বিশেষ করে সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত চোকো প্রদেশ সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন। ক্ষতিগ্রস্তদের উদ্ধার, চিকিৎসা প্রদান ও জরুরি পুনর্বাসনের জন্য তিনি ১ হাজার ৮০ কোটি ডলারেরও বেশি সহায়তার বিশেষ বাজেট ঘোষণা করেছেন।
বিশ্বজুড়ে কফি উৎপাদনের জন্য প্রসিদ্ধ কলম্বিয়া বিশ্ববাজারে তৃতীয় বৃহত্তম কফি সরবরাহকারী দেশ। এই দুর্যোগের মুহূর্তে রাষ্ট্রীয় দুর্যোগ মোকাবিলা বাহিনী ও ফায়ার সার্ভিসের পাশাপাশি উদ্ধারকাজে নামেন সাধারণ নাগরিক ও নানা সামাজিক সংগঠন। বিশেষ করে দেশটির কফি উৎপাদনকারীদের জাতীয় সংস্থা ‘ন্যাশনাল কফি ফেডারেশন’-এর স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী দ্রুত উদ্ধারকাজে যোগ দেয় এবং ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ শুরু করে।
ভূমিকম্পের তীব্রতায় বহু বহুতল ভবন, আবাসিক ঘরবাড়ি ও অবকাঠামো ধসে বা হেলে পড়েছে। এতে গৃহহীন হয়ে পড়েছেন হাজার হাজার মানুষ। ভূ-কম্পনের পর পরবর্তী আফটারশকের আশঙ্কায় এবং থাকার জায়গা না থাকায় গৃহহারা অধিবাসীরা খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন। কালি ও পেরেইরাসহ বড় শহরগুলোতে চরম মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলো রাস্তার পাশে অস্থায়ী আশ্রয় নিয়ে রান্নাবান্না ও জীবন ধারণ করছে, আর অনেকে ভেঙে পড়া ঘরবাড়ির স্তূপ ঘেঁটে নিজেদের প্রয়োজনীয় সম্পদ বা স্বজনদের খোঁজে তন্ন তন্ন করে সন্ধান চালাচ্ছেন।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা ফুটে উঠেছে স্বাস্থ্য বিভাগগুলোর প্রতিবেদনেও। ধ্বংসের মুখে পড়া কালি শহরের প্রশাসন জানিয়েছে, একের পর এক মরদেহ উদ্ধার হয়ে আসায় শহরের প্রধান মর্গে আর স্থান সংকুলান হচ্ছে না। লাশে পূর্ণ হয়ে যাওয়ায় জরুরি ভিত্তিতে বিকল্প উপায়ে মরদেহ সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। জরুরি সেবা বিভাগগুলো রাতদিন কাজ করে গেলেও বহু এলাকা দুর্গম হওয়ায় ত্রাণ ও উদ্ধার সরঞ্জাম পৌঁছাতে বেগ পেতে হচ্ছে। সময়ের সাথে সাথে নিখোঁজদের জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে আসলেও উদ্ধারকারীরা আশাবাদী হয়ে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন।


