অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক
রাজধানী ঢাকার যানজট নিরসন এবং গণপরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে অঞ্চলভিত্তিক রিকশা চলাচল ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি)। একই সঙ্গে ব্যাটারিচালিত রিকশাসহ সব ধরনের অননুমোদিত যানকে নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে আনতে কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। সম্প্রতি নগর ভবনে আয়োজিত এক বিশেষ বৈঠকে ডিএসসিসি প্রশাসক এবং সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকরা এই সার্বিক পরিকল্পনা তুলে ধরেন।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে রাজধানী ঢাকার সড়কগুলোতে ব্যাটারিচালিত রিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচল এবং ট্রাফিক আইন অমান্যের প্রবণতা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে গত বছরের আগস্টের পর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নতুন করে বিপুল সংখ্যক ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ভাসমান মানুষ ঢাকায় প্রবেশ করেছে। এর ফলে নগরীর প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলি পর্যন্ত সর্বত্র তীব্র যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক যাতায়াতকে ব্যাহত করছে।
ডিএসসিসি প্রশাসকের ভাষ্য অনুযায়ী, এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানের অংশ হিসেবে রাজধানী ঢাকাকে কয়েকটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে বিভক্ত করা হবে। অঞ্চলভিত্তিক এই ব্যবস্থাপনার আওতায় এক এলাকার রিকশা অন্য এলাকায় চলাচল করতে পারবে না। উদাহরণস্বরূপ, ডেমরা এলাকার কোনো রিকশা নিউ মার্কেট বা অন্য কোনো দূরবর্তী এলাকায় গিয়ে যানজট সৃষ্টি করতে পারবে না। এছাড়া নির্দিষ্ট এলাকার ভেতরে রিকশার গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করতে দিনভিত্তিক এবং সড়কভিত্তিক আলাদা বিধিনিষেধ আরোপ করা হবে। কোনোভাবেই লাইসেন্স ছাড়া বা অননুমোদিত উপায়ে কাউকে ঢাকা শহরে রিকশা চালাতে দেওয়া হবে না।
প্রশাসন মনে করছে, অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং ঢাকামুখী জনস্রোত রাজধানী ব্যবস্থাপনার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। বন্যা, নদীভাঙন কিংবা জীবিকার অন্বেষণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এসে মানুষ ফুটপাত বা উন্মুক্ত স্থানে বসতি স্থাপন করছে এবং রিকশা চালানো বা ভ্যানে পণ্য বিক্রির পেশায় যুক্ত হচ্ছে। এই নিয়ন্ত্রণহীন অভিবাসন রোধ এবং নগরীর ধারণক্ষমতা বজায় রাখতে রিকশা ও সংশ্লিষ্ট পরিবহন খাতকে কঠোরভাবে নিবন্ধনের আওতায় আনা জরুরি হয়ে পড়েছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইন ও বিধিবিধান প্রণয়নের কাজ বর্তমানে শেষ পর্যায়ে রয়েছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে নির্দিষ্ট আইন প্রণয়ন করে সিটি কর্পোরেশনের কাছে হস্তান্তরের পর তা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হবে।
রিকশার পাশাপাশি গণপরিবহন ব্যবস্থার শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। রাজধানীতে চলাচলকারী বাসগুলোর যত্রতত্র থামানো এবং যেখানে-সেখানে যাত্রী ওঠানামা করার প্রবণতা বন্ধ করতে নতুন ট্রাফিক নির্দেশনা কার্যকর করার প্রক্রিয়া চলছে। পরিবহন মালিক, শ্রমিক ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে বাসগুলোকে নির্ধারিত স্টপেজ ব্যবহার করতে বাধ্য করা হবে। এই পদক্ষেপগুলো সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে আগামী কয়েক মাসের মধ্যে নগরীর সামগ্রিক পরিবহন ব্যবস্থায় দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে বলে আশা করছে সিটি কর্পোরেশন।
এদিকে, স্থানীয় সরকার প্রশাসন দেশব্যাপী ই-রিকশা বা ব্যাটারিচালিত রিকশার ব্যবস্থাপনার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়নের কাজ হাতে নিয়েছে। স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন এবং সংশ্লিষ্ট সংশোধিত আইনের আলোকে এই নীতিমালা চূড়ান্ত করা হচ্ছে। এই নীতিমালা বাস্তবায়িত হলে সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ এলাকায় ই-রিকশা চলাচল একটি শৃঙ্খলার মধ্যে আসবে। পাশাপাশি, নিয়মতান্ত্রিক লাইসেন্সিং ও নিবন্ধন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব আয়ও বৃদ্ধি পাবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করছেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কেবল প্রশাসনিক নির্দেশ জারি করে ঢাকার দীর্ঘদিনের যানজট সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এর জন্য দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পাশাপাশি নগরবাসীর সম্মিলিত সচেতনতা ও সহযোগিতা অপরিহার্য। ট্রাফিক আইন মেনে চলা এবং যত্রতত্র আইন অমান্য করার প্রবণতা পরিহার না করলে কোনো উদ্যোগই পুরোপুরি সফল হবে না। ঢাকাকে একটি বসবাসযোগ্য, আধুনিক ও যানজটমুক্ত তিলোত্তমা নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে প্রশাসন, স্থানীয় সরকার এবং নগরবাসীকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।


