বহু বছর পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচন: প্রার্থী দেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করল বিরোধী জোট

বহু বছর পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচন: প্রার্থী দেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করল বিরোধী জোট

রাজনীতি ডেস্ক
দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় পর সংসদীয় গণতন্ত্রে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন গতিপ্রবাহ তৈরি হয়েছে। ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীর পাশাপাশি বিরোধী জোট থেকেও প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে। আসন্ন এই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার পেছনে সুনির্দিষ্ট কৌশলগত ও রাজনৈতিক কারণ রয়েছে বলে জানিয়েছে বিরোধী জোট। তাদের মতে, কেবল জয়-পরাজয়ের হিসাব নয়, বরং গণতান্ত্রিক ধারাকে অর্থবহ করা এবং জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করাই এই সিদ্ধান্তের মূল চালিকাশক্তি।
পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, অতীতেও ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। বর্তমান পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় রাষ্ট্রপতি পদে ২৩তম রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির পক্ষ থেকে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, বিরোধী জোটের পক্ষ থেকে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান ও অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল অলি আহমদকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী করা হয়েছে।
সংসদে নির্দিষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকা সত্ত্বেও বিরোধী জোটের এই প্রার্থী দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে। এ বিষয়ে জোট নেতাদের বক্তব্য স্পষ্ট। তাদের মতে, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনা এবং গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়াই তাদের প্রধান উদ্দেশ্য। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচিত হওয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে জনগণের সামনে একটি প্রতিযোগিতামূলক ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনী প্রক্রিয়া তুলে ধরতে চায় বিরোধী জোট।
এ প্রসঙ্গে ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি বা এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষেত্রে জনগণের স্বার্থ সর্বাধিক গুরুত্ব পাওয়া উচিত। যদি কোনো রাজনৈতিক দল এককভাবে প্রার্থী দিয়ে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী করার ধারা বজায় রাখে, তবে তা রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী স্বার্থের অনুকূল নয়। বরং একটি প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে অভিভাবক নির্বাচন করা হলে তা জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করতে এবং সাংবিধানিক পদটির নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে সহায়তা করে।
বিরোধী জোটের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই সিদ্ধান্ত কেবল রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর পেছনে একটি সুদূরপ্রসারী আদর্শগত বার্তাও রয়েছে। দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে একজন প্রবীণ রাজনীতিবিদ এবং মুক্তিযোদ্ধা ব্যক্তিত্বকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অভিভাবক হিসেবে সামনে আনার চেষ্টা করা হয়েছে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির একটি নিজস্ব স্বকীয়তা ও আদর্শগত অবস্থান থাকা আবশ্যক। পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গণতান্ত্রিক চর্চাকে জনগণের সামনে নতুন মাত্রায় উপস্থাপন করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। নতুন রাষ্ট্র গঠনের যে আকাঙ্ক্ষা জনগণের মধ্যে তৈরি হয়েছে, তার একটি ইতিবাচক বার্তা এর মাধ্যমে পাঠানো সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।
জামায়াতে ইসলামীর এই নেতা আরও বলেন, জামায়াতে ইসলামীসহ সমমনা দলগুলো একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠন করতে চায়। দলীয় গণ্ডি, সংকীর্ণ রাজনৈতিক চিন্তা এবং নিজস্ব আদর্শিক সীমানার বাইরে গিয়ে দেশ ও জনগণের বৃহত্তর স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি। আর সে কারণেই দলীয় পরিচয়ের বাইরে জাতীয় ঐকমত্যের প্রতীক হিসেবে একজন গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্বকে মনোনীত করা হয়েছে।
সারোয়ার তুষার এ বিষয়ে যোগ করেন যে, বিরোধী জোটে অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কাছে গ্রহণযোগ্যতা এবং জ্যেষ্ঠতার বিচারে কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে প্রার্থী হিসেবে বেছে নেওয়া একটি সময়োপযোগী ও সঠিক সিদ্ধান্ত হয়েছে। এটি কেবল একটি পদের জন্য লড়াই নয়, বরং সার্বিকভাবে দেশের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সমুন্নত রাখার একটি প্রচেষ্টা।
এদিকে, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সংস্কারের রূপরেখা ও জুলাই সনদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ সদস্যদের ভোটদান প্রক্রিয়া দলীয় প্রভাব ও হুইপের আওতামুক্ত রাখার দাবি জানিয়েছে বিরোধী জোট। তাদের মতে, এ ধরনের সংস্কার নিশ্চিত করা গেলে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো আরও শক্তিশালী হবে এবং রাষ্ট্রপতির পদটি প্রকৃত অর্থে সকল বিতর্কের ঊর্ধ্বে একটি জাতীয় ঐক্যের প্রতীকে পরিণত হতে পারবে।
রাজনীতি শীর্ষ সংবাদ