আইন আদালত ডেস্ক
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি আবুল কালাম আযাদের আপিল শুনানি পিছিয়ে আগামী ৩১ আগস্ট দিন ধার্য করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ।
সোমবার (১৭ আগস্ট) বিচারপতি মো. রেজাউল হকের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আপিল বিভাগীয় বেঞ্চ শুনানি মুলতবি করে নতুন এই দিন নির্ধারণ করেন। এর আগে গত ১০ আগস্ট রাষ্ট্রপক্ষের সময়ের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আজকের দিন ধার্য করা হয়েছিল।
শুনানি শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম মামলার আইনগত নানা দিক ও রাষ্ট্রপক্ষের অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, ২০১৩ সালের ২১ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ আবুল কালাম আযাদকে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন। রায় ঘোষণার সময় তিনি পলাতক ছিলেন এবং দীর্ঘ সময় বিদেশে অবস্থান করেন।
চিফ প্রসিকিউটরের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আবুল কালাম আযাদ দেশে ফিরে আসেন এবং তৎকালীন সরকারের কাছে সাজা মওকুফ বা স্থগিতের আবেদন করেন। ওই আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে নির্বাহী আদেশে তার মৃত্যুদণ্ডের কার্যকারিতা এক বছরের জন্য স্থগিত করা হয়। মূলত সেই স্থগিতাদেশের ওপর ভিত্তি করে তিনি আপিল বিভাগে ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল দায়ের করেন। সম্প্রতি ওই স্থগিতাদেশের মেয়াদ বাড়ানোর জন্যও তার পক্ষ থেকে আবেদন করা হয়েছে, যার তীব্র বিরোধিতা করেছে রাষ্ট্রপক্ষ।
আপিল দায়েরের আইনগত বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন, ১৯৭৩-এর ২১(৩) ধারা অনুযায়ী রায়ের ৩০ দিনের মধ্যে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিকে আপিল করতে হয়। নির্ধারিত ৩০ দিন অতিবাহিত হওয়ার পর আইন অনুযায়ী আপিল করার কোনো বৈধ সুযোগ নেই। ফলে সময়ের বাধ্যবাধকতা পেরিয়ে যাওয়ায় এই আপিলটি আইনত সরাসরি তামাদি ও অগ্রহণযোগ্য।
আসামিপক্ষের আইনগত কৌশল প্রসঙ্গে তিনি জানান, আসামিপক্ষ সংবিধানের ১০৪ অনুচ্ছেদে বর্ণিত ‘কমপ্লিট জাস্টিস’ বা পূর্ণাঙ্গ ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার নীতির আশ্রয় নিয়ে আপিলটি গ্রহণ করার আবেদন জানিয়েছে। তবে রাষ্ট্রপক্ষের সুস্পষ্ট যুক্তি হলো, যেখানে একটি বিশেষ আইনে সুনির্দিষ্ট সময়সীমা ও বিধিনিষেধ উল্লেখ রয়েছে, সেখানে সংবিধানের সাধারণ অনুচ্ছেদ প্রয়োগ করে আইনের বাধ্যবাধকতা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড স্থগিত রেখে কোনোভাবেই সংবিধিবদ্ধ আইনকে অতিক্রম করে আপিল করা যায় না।
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সংঘটিত হত্যা, গণহত্যা, লুণ্ঠন ও ধর্ষণের মতো আটটি মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আবুল কালাম আযাদের বিচার সম্পন্ন হয়েছিল। ২০১৩ সালে ট্রাইব্যুনালের ঘোষিত রায়ে সাতটি অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়। ট্রাইব্যুনালের ইতিহাসে সেটিই ছিল প্রথম কোনো মামলার রায়। রায়ের পর থেকেই তিনি পলাতক থাকায় আইনি প্রক্রিয়ায় ট্রাইব্যুনালের রায় কার্যকর করার প্রক্রিয়া স্থগিত ছিল।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে পলাতক আসামিদের নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে আপিল করার বিধান অত্যন্ত স্পষ্ট। ফলে দীর্ঘ এক দশক পর দেশে ফিরে নির্বাহী আদেশের ওপর ভর করে করা এই আপিল গ্রহণযোগ্য হবে কি না, তা নিয়ে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের এই শুনানির সিদ্ধান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির সৃষ্টি করতে যাচ্ছে। আগামী ৩১ আগস্ট আপিল বিভাগে এ বিষয়ে পরবর্তী শুনানি অনুষ্ঠিত হবে।


