বিনোদন ডেস্ক
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী অভিনেতা, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক সংসদ সদস্য আকবর হোসেন পাঠান ফারুক। দেশীয় চলচ্চিত্রে গ্রামীণ পটভূমি ও সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রামের রূপায়ণে তিনি ছিলেন এক অনন্য চরিত্র। মুক্তিযুদ্ধপূর্ব আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে তাঁর অবদান সুদূরপ্রসারী।
১৯৪৮ সালের ১৮ আগস্ট গাজীপুরে জন্মগ্রহণ করেন আকবর হোসেন পাঠান। তাঁর পিতা আজগার হোসেন পাঠান। সাত ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন কনিষ্ঠ। কৈশোর থেকেই তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক বাস্তবতার সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হন।
ষাটের দশকের উত্তাল ছাত্ররাজনীতি থেকে তাঁর প্রকাশ্য রাজনৈতিক জীবনের সূচনা ঘটে। ১৯৬৬ সালের ঐতিহাসিক ছয় দফা আন্দোলন এবং ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনের ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি অস্ত্র হাতে সম্মুখ সমরে অংশ নেন। স্বাধীনতার পরও তিনি রাজনৈতিক আদর্শে অবিচল ছিলেন এবং আমৃত্যু বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাথে সম্পৃক্ত থেকেছেন। ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ঢাকা-১৭ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এছাড়া তিনি বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। ব্যক্তিগত জীবনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি তাঁর ছিল গভীর শ্রদ্ধা। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর গভীর শোক প্রকাশ করে তিনি আজীবন নিজের জন্মদিন উদযাপন থেকে বিরত থাকেন।
মুক্তিযুদ্ধের বছর অর্থাৎ ১৯৭১ সালে এইচ আকবর পরিচালিত ‘জলছবি’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে রূপালি পর্দায় আত্মপ্রকাশ ঘটে ফারুকের। এ চলচ্চিত্রে তাঁর বিপরীতে অভিনয় করেছিলেন অভিনেত্রী কবরী। পরবর্তীতে ১৯৭৩ সালে খান আতাউর রহমানের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘আবার তোরা মানুষ হ’ এবং ১৯৭৪ সালে নারায়ণ ঘোষ মিতার ‘আলোর মিছিল’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করে তিনি নিজের অভিনয় প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন।
১৯৭৫ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘সুজন সখী’ ও ‘লাঠিয়াল’ চলচ্চিত্র দুটির আকাশচুম্বী সাফল্য ফারুককে শীর্ষ তারকাদের সারিতে অধিষ্ঠিত করে। পরবর্তী চার দশক ধরে তিনি বহু স্মরণীয় চলচ্চিত্রে কেন্দ্রীয় চরিত্রে কাজ করেন। তাঁর অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে ‘নয়নমনি’, ‘সারেং বৌ’, ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’, ‘মাটির মায়া’, ‘সূর্যগ্রহণ’, ‘নদের চাঁদ’, ‘সখী তুমি কার’, ‘দোস্তী’, ‘লাল কাজল’, ‘ঝিনুকমালা’, ‘বিরাজ বৌ’, ‘শিমুল পারুল’, ‘মিয়া ভাই’, ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা’, ‘জীবন সংসার’ এবং ‘কোটি টাকার কাবিন’। বিশেষ করে ‘মিয়া ভাই’ চলচ্চিত্রের বিপুল জনপ্রিয়তার পর তিনি চলচ্চিত্রাঙ্গন ও সাধারণ মানুষের কাছে এই নামেই পরিচিতি লাভ করেন। অভিনয়ের পাশাপাশি চলচ্চিত্র প্রযোজনা ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডেও তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল।
চলচ্চিত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ফারুক বহু রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক সম্মাননায় ভূষিত হন। ১৯৭৫ সালে ‘লাঠিয়াল’ চলচ্চিত্রের জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতা বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। পরবর্তীতে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পে দীর্ঘকালীন অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০১৬ সালে তাঁকে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের ‘আজীবন সম্মাননা’ প্রদান করা হয়।
দীর্ঘদিন দূরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন থাকার পর ২০২৩ সালের ১৫ মে সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন এই মুক্তিযোদ্ধা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। তাঁর মৃত্যুতে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে।


