পারস্পরিক আস্থা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধার ভিত্তিতেই হতে পারে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর: পররাষ্ট্র উপদেষ্টা

পারস্পরিক আস্থা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধার ভিত্তিতেই হতে পারে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর: পররাষ্ট্র উপদেষ্টা

কূটনৈতিক ডেস্ক
পারস্পরিক আস্থা, সার্বভৌমত্বের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা এবং সম্মানজনক আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবের ভিত্তিতে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হলেই কেবল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর অনুষ্ঠিত হতে পারে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট জাতীয় স্বার্থ বজায় রেখে বাংলাদেশ তাড়াহুড়ো না করার নীতি বজায় রাখছে বলেও তিনি স্পষ্ট করেন।
সম্প্রতি রাজধানীর মিন্টু রোডের সরকারি বাসভবনে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে সরকারের আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক কৌশল, আঞ্চলিক ভারসাম্য ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নানা দিক নিয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা।
আসন্ন ব্রিকস সম্মেলনের প্রাক্কালে ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রচারিত সম্ভাব্য শীর্ষ সফর সংক্রান্ত প্রতিবেদনের বিষয়ে উপদেষ্টা জানান, এসব জল্পনা-কল্পনা ভিত্তিহীন ও অনুমাননির্ভর। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের সরকারপ্রধানের শীর্ষ সফরের বিষয়টি প্রতিবেশী দেশের বর্তমান নেতৃত্বের দৃষ্টিভঙ্গি এবং বাস্তবমুখী মূল্যায়নের ওপর নির্ভরশীল। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট এবং জনগণের বিপুল ম্যান্ডেট নিয়ে দায়িত্ব পালনকারী নির্বাচিত সরকারের প্রতি কার্যকর সম্মান প্রদর্শনের মাধ্যমেই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের টেকসই ভিত্তি রচিত হতে পারে। সুনির্দিষ্ট জাতীয় স্বার্থ নিশ্চিত হওয়া ছাড়া কেবল শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠানের কোনো অবকাশ নেই। তবে দুই দেশের পারস্পরিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি হলে বহুপাক্ষিক সম্মেলনে অংশগ্রহণের বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করা হবে।
একই সঙ্গে তিনি ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশের বিচারাধীন ও দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের রাজনৈতিক বা গণমাধ্যমে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ প্রদানের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি জানান, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক রীতি ও দ্বিপক্ষীয় দায়বদ্ধতার আলোকে বিষয়টি কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়। এ বিষয়ে ইতোমধ্যে কূটনৈতিক মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক বার্তা পাঠানো হয়েছে এবং দেশের স্থিতিশীলতা ক্ষুণ্নকারী যেকোনো তৎপরতা রোধে দ্বিপক্ষীয় ও আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর আওতায় পদক্ষেপ অব্যাহত থাকবে।
বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রনীতির গতিপথ তুলে ধরে উপদেষ্টা বলেন, ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিকে প্রাধান্য দিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একটি বাস্তবমুখী ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি পরিচালনা করা হচ্ছে। অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে বহুমুখী অংশীদারত্ব বজায় রাখতে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মতো দেশগুলোর সঙ্গে ইতিবাচক সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি করা হচ্ছে। গ্রীষ্মকালের পরপরই প্রধানমন্ত্রীর সৌদি আরব সফরের সম্ভাবনা রয়েছে। একই সাথে পাকিস্তানের সঙ্গে স্বাভাবিক বাণিজ্যিক ও দ্বিপক্ষীয় যোগাযোগ জোরদার করা হচ্ছে।
পশ্চিমা বিশ্ব ও প্রধান বৈশ্বিক অর্থনীতির দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক কূটনীতি জোরদারের বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। অন্যদিকে চীনের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার, ‘টু প্লাস টু’ মেকানিজম এবং সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) বৃদ্ধির লক্ষ্যে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরে তিনি জানান, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে আফ্রিকার ব্যাপক সমর্থন দেশের কূটনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার বহিঃপ্রকাশ। এই কূটনৈতিক সাফল্যকে কাজে লাগিয়ে আফ্রিকার উদীয়মান বাজারে কৃষি ও বাণিজ্যিক চুক্তি স্বাক্ষরের প্রক্রিয়া চলছে। পাশাপাশি দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটিয়ে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে পুনরায় কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়াও ইতিবাচক অগ্রগতির পথে রয়েছে।
উপদেষ্টা আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক প্ল্যাটফর্মগুলোকে কার্যকরভাবে ব্যবহারের মাধ্যমে রোহিঙ্গা সংকটের মতো দীর্ঘস্থায়ী মানবিক ও আঞ্চলিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মিয়ানমার ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের ওপর কার্যকর চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব হবে। একটি সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবমুখী পররাষ্ট্রনীতির মাধ্যমে বৈশ্বিক অঙ্গনে দেশের মর্যাদা ও সার্বভৌম স্বার্থ সুসংহত করার প্রয়াস অব্যাহত থাকবে।
জাতীয় শীর্ষ সংবাদ