প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিতে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বিত উদ্যোগ

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিতে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বিত উদ্যোগ

জাতীয় ডেস্ক
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার ও সেবাকে কোনো অনুকম্পা বা চ্যারিটি হিসেবে নয়, বরং সাংবিধানিক ও অবিচ্ছেদ্য নাগরিক অধিকার হিসেবে বিবেচনা করে নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে কাজ করছে সরকার। অন্য সব সাধারণ নাগরিকের মতোই প্রতিটি প্রতিবন্ধী ব্যক্তি যেন সমান অধিকার, সুযোগ ও মর্যাদা ভোগ করতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত ‘প্রতিবন্ধী অধিকার ও সেবা সুরক্ষাবিষয়ক আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় ও বাস্তবায়ন কমিটি’র সভায় এই দিকনির্দেশনা উঠে আসে। সভায় স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত এবং সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন পুতুল সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ ও ভবিষ্যত রূপরেখা তুলে ধরেন।
সভায় স্বাস্থ্যপ্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত জানান, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের চিকিৎসাসেবা তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে দেশের ২২টি জেলার ২২টি উপজেলায় পাইলট প্রকল্প হিসেবে ‘শিশু স্বর্গ’ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এর মাধ্যমে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতেই প্রতিবন্ধী শিশু ও ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয় সার্বিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে। এ ছাড়া রাজধানীর সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে অন্তর্ভুক্ত করতে ঢাকার কড়াইল বস্তিতে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের প্রাথমিক শনাক্তকরণ ও ধারাবাহিক স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমের আওতা বাড়ানো হয়েছে। পর্যায়ক্রমে এই সেবা সারা দেশের সব স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সম্প্রসারণ করার পরিকল্পনা রয়েছে।
যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করে স্বাস্থ্যপ্রতিমন্ত্রী বলেন, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ইতিমধ্যে যোগাযোগ ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ রেলওয়ের যেকোনো শ্রেণিতে এবং মেট্রোরেলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের যাতায়াত সহজ করতে ভাড়ায় ২৫ শতাংশ ছাড় কার্যকর করা হয়েছে।
একই সঙ্গে দেশের নবনির্মিতব্য সব রেলস্টেশন ও গণপরিবহন অবকাঠামোকে প্রতিবন্ধীবান্ধব করার সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। শুধু চলাচলের জন্য র‍্যাম্প নির্মাণ নয়, বরং টিকিট সংগ্রহ থেকে শুরু করে যানবাহনে ওঠা-নামা এবং আধুনিক টয়লেট ব্যবহারসহ পুরো যাতায়াত প্রক্রিয়া যাতে সার্বজনীন প্রবেশগম্য (ইউনিভার্সাল এক্সেসিবিলিটি) হয়, সে বিষয়ে কঠোর তদারকি নিশ্চিত করা হচ্ছে।
শিক্ষাক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী শিশুদের সমান সুযোগ নিশ্চিতকরণের ওপর জোর দিয়ে ড. মুহিত বলেন, মূলধারার শিক্ষাব্যবস্থায় বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিশেষায়িত বিদ্যালয়গুলোর প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি শিক্ষাদান পদ্ধতি আরও আধুনিকায়ন করা হচ্ছে।
এর পাশাপাশি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যৌথ সমন্বয়ের মাধ্যমে সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকেও অন্তর্ভুক্তিমূলক করা হচ্ছে। বিদ্যালয়গুলোতে ভৌত অবকাঠামোগত পরিবর্তন আনার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যেন হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী কোনো শিক্ষার্থী ক্লাসে প্রবেশে বাধার সম্মুখীন না হয়। পাঠ্যক্রমে প্রয়োজনীয় আধুনিকায়ন, শিক্ষকদের বিশেষ প্রশিক্ষণ, ব্রেইল পদ্ধতির বই সরবরাহ এবং সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ বা ইশারা ভাষার ব্যবহার বাড়াতে কার্যকর পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
সভায় সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন পুতুল বলেন, শুধুমাত্র দৃশ্যমান ভৌত অবকাঠামো নয়, বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতেও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। ওয়েব পোর্টাল, নাগরিক সেবার ডিজিটাল মাধ্যম এবং অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমে যেন বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিরা সহজে অংশ নিতে পারেন, সে জন্য প্রযুক্তিগত মানদণ্ড নির্ধারণ করা হচ্ছে।
সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী আরও জোর দিয়ে বলেন, প্রতিটি প্রতিবন্ধী মানুষের মধ্যে থাকা অনন্য মেধা, কর্মদক্ষতা ও সৃজনশীলতাকে জাতীয় অর্থনীতিতে যুক্ত করতে হবে। তাদেরকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করে স্বাবলম্বী করা এবং একটি বৈষম্যহীন, মানবিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলাই বর্তমান সরকারের অন্যতম লক্ষ্য। এসব উদ্যোগের সফল ও সময়োপযোগী বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় ও সংস্থাকে পারস্পরিক সমন্বয় বাড়িয়ে সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করার তাগিদ দেওয়া হয়।
জাতীয় শীর্ষ সংবাদ